জেলিফিশ গভীর সমুদ্র ছেড়ে যে কারণে উপকূলে
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব খাদ্য সংকট ও অতিরিক্ত লবণাক্ততাকে দুষছেন মৎস্য গবেষকরা
ফাইল ছবি
সুমন চৌধুরী, বরিশাল ও আসাদুজ্জামান মিরাজ, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৪ | ০০:১৫
পটুয়াখালীর কুয়াকাটার হোসনেপাড়া এলাকার জেলে মামুন হোসেন উপকূলের ৩০ ফুট দূরে প্রায় ৯০ হাত লম্বা জাল ফেলে মাছ ধরেন। এই মার্চে একাধিকবার তাঁর জালে ২০০ থেকে ৪০০টি জেলিফিশ ধরা পড়ে। একেকটির ওজন আধা কেজি থেকে তিন কেজি পর্যন্ত। এতে অতিরিক্ত ওজনের জাল তুলতে না পেরে কেটে সাগরে ফেলে দেন। উপকূলের কাছাকাছি থেকে যারা মাছ ধরেন তারা সবাই মামুনের মতো একই সংকটে আছেন।
এক মাস ধরে অস্বাভাবিক জেলিফিশ ধরা পড়ছে জেলের জালে। গত তিন থেকে চার বছর ধরে মৌসুমের এই সময়ে নিয়মিত এমন সমস্যায় পড়ছেন জেলেরা। গভীর সমুদ্রের প্রাণী জেলিফিশ কেন উপকূলে এসে জালে ধরা পড়ছে, এর কারণ এখনও অজানা। বিষয়টি নিয়ে দেশে কোনো গবেষণাও নেই।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল হক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্য অনুষদের অধ্যাপক ড. ইয়ামিনের সঙ্গে সমকালের কথা হয়।
তিন অধ্যাপকেরই অভিন্ন মত। তারা বলছেন, প্রধানত দুটি কারণে জেলিফিশ উপকূলের দিকে আসছে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে গভীর সমুদ্রে বসবাসের প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গভীর সমুদ্রে খাদ্য সংকট এবং পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা জেলিফিশের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠা। এ দুটি কারণে প্রাণীটি উপকূলের দিকে চলে আসায় জালে আটকা পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জীববৈচিত্র্যের স্বার্থে জেলিফিশ বাঁচানো প্রয়োজন। এখনই এ নিয়ে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেন এই তিন শিক্ষাবিদ। অনথ্যায় সাগরে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল হক বলেন, শুধু কুয়াকাটা নয়; কক্সবাজার উপকূলেও অস্বাভাবিক জেলিফিশ ধরা পড়ছে। প্রতিবছর এ সংখ্যা বাড়ছে। জেলিফিশ গভীর সমুদ্রে থাকে। নিশ্চয় সেখানে এমন কোনো পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা প্রাণীটি থাকার উপযোগী নয়। এ ক্ষেত্রে সমুদ্রে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সাগরে এক মাছের ডিম, রেণু ও মল অন্য মাছ খায়। এ হিসেবে জেলিফিশও অন্য মাছের রেণু-ডিম খেয়ে জীবন ধারণ করে। খাবারের চাহিদা পূরণ করতে সাগরে সব প্রজাতির মাছ বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাই জেলিফিশ রক্ষায় করণীয় নিয়ে এখনই গবেষণা করা উচিত বলে মত দেন ড. সাজেদুল হক।
অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হকের মতে, অপরিকল্পিত মাছ আহরণে গভীর সাগরে রেণু ও ডিম বিনাশ হচ্ছে। এতে মাছের খাদ্য সংকটের শঙ্কা উড়িয়ে দেওযা যায় না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, খাদ্যের সন্ধানে গভীর সাগর ছেড়ে জেলিফিশ উপকূলের দিকে আসছে। এ অধ্যাপকের মতে, খাদ্য সংকট হলে এর বিরূপ প্রভাব সব প্রজাতির মাছের ওপর পড়বে।
ড. ইয়ামিনের মতে, বেশির ভাগ মাছ ডিম ও রেণু দেয় উপকূলের কাছাকাছি। উপকূলের দিকে জেলিফিশ বেশি সংখ্যায় এলে ডিম ও রেণু খেয়ে ফেলে অন্য মাছের প্রজনন বিনাশ করবে। তাই এটিকে গভীর সাগরে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপারে গবেষণা প্রয়োজন।
কুয়াকাটার ঝাউবন এলাকার ষাটোর্ধ্ব জেলে মোখলেসুর রহমান বলেন, ৫০ বছরের বেশি সময় মাছ ধরার পেশায় আছি। প্রতিবছর এ মৌসুমে উপকূলে জেলিফিশ আসে এবং জেলেদের জালে ধরা পড়ে। তবে গত তিন-চার বছর ধরে এর মাত্রা বেড়েই চলেছে।
কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, প্রতিবছর মৌসুমের এ সময়ে উপকূলে জেলিফিশ বেশি দেখা দেয়। জোয়ারে ভেসে এসে ভাটার সময়ে তীরে আটকে যায়। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ সংকট কেটে যাবে বলে মত দেন তিনি।
বিভিন্ন তথ্য বলছে, জেলিফিশ মেরুদণ্ডহীন প্রাণী। এর মাথা, হৃৎপিণ্ড, লেজ, হাত-পা কিছুই নেই। এটি মূলত সামুদ্রিক প্রাণী। নামে ফিশ হলেও এটি মাছ নয়। কোনো প্রজাতির জেলিফিশের আকৃতি উল্টানো বাটির মতো, আবার কারও গঠন ঘণ্টার মতো। পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি-মার্চে কুয়াকাটা উপকূলে সাদা প্রজাতির জেলিফিশ দেখা যায়।
- বিষয় :
- জেলিফিশ
