চট্টগ্রামে সাবাড় হচ্ছে এক ডজন পাহাড়
করোনার মধ্যেই চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে সেমিপাকা ঘর। পাহাড়ের ক্ষত ঢাকতে সেখানে রোপণ করা হয়েছে কলাগাছ- সমকাল
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২০ | ১৫:৩৬
মূল সড়কের পাশেই লাগোয়া পাহাড়টি। কিন্তু এটি সাবাড় করা হচ্ছে দিনদুপুরেই। রাতের আঁধারে পেট্রোল ঢেলে প্রথমে পোড়ানো হয়েছে আগাছা। পোড়া আগাছা তোলার নামে দিনের বেলায় ন্যাড়া করা হয়েছে পাহাড়ের একাংশ। এর আগেই পাহাড়ের পাদদেশে এনে রাখা হয় ইট, বালি ও সিমেন্ট। কিছু শ্রমিক সেমিপাকা ঘর তুলছে আর অন্যরা কাটছে পাহাড়।
সাধারণত পাহাড় কাটার কিছুদিন পরে ভবন উঠায় দখলদাররা। তবে প্রশাসনের চোখকে ধুলো দিতে এখানে ভবন তৈরি ও পাহাড় কাটার কাজ করা হয়েছে একসঙ্গেই। আরও কিছু বুদ্ধি খাটিয়েছে দখলদাররা। পাহাড় কাটার ক্ষত ঢাকতে ও ধস ঠেকাতে তারা কাটা পাহাড়ের চারপাশে রোপণ করে দিয়েছে কলা গাছ!
নগরীর জঙ্গল সলিমপুরে একটি পাহাড় দখল করা হয়েছে এমন অভিনব পদ্ধতিতে। পাশের জালালাবাদ পাহাড় কাটা হয়েছে আরও সুকৌশলে। এটি দখল করতে ঘরের বাইরে মাদ্রাসা, হেফজখানা ও এতিমখানার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহ দূর করতে পরে আবার এটির নামকরণ করা হয়েছে দেশের অন্যতম বড় শিল্প গ্রুপ পিএইচপির মালিক সুফী মিজানের নামে।
মূল দখলদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে তৃতীয় একটি পক্ষকে দিয়ে চট্টগ্রামে এভাবে দখল করা হয়েছে অন্তত ১২টি পাহাড়। প্রশাসনের মামলা এড়াতে মূল দখলদাররা এসব ঘর তৈরি করে ভাড়া দিচ্ছে দ্বিতীয় আরেকটি পক্ষের মাধ্যমে। পাহাড় কাটার আগে আশপাশের আধা কিলোমিটারের মধ্যে ছদ্মবেশে পাহারাদার রাখে তারা। প্রশাসনের লোক যাওয়ার আগেই এই পাহারাদাররা খবর দিয়ে দেয় ঘর নির্মাণকারীদের। যাতে প্রশাসন যাওয়ার আগেই পালিয়ে যেতে পারে সবাই।
এভাবে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে সেমিপাকা ঘর। আবার মাদ্রাসার সাইনবোর্ড দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বসতঘর। জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম সরেজমিন দেখে এসেছেন করোনার ফাঁকে তোলা এসব ঘর। তিনি বিষয়টি অবহিত করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরকেও। শিগগির অভিযান শুরু করে তাদের উচ্ছেদ করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, 'করোনার সময় ছিল সাধারণ ছুটি। এই সুযোগে রাতারাতি কয়েকটি পাহাড় দখল করে ঘর তুলেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। নিজেদের আড়ালে রেখে তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে অভিনব কৌশলে এসব ঘর তুলেছে তারা। যারা এখন এসব ঘরে আছেন তারা জানেনও না দখলদারদের প্রকৃত নাম-ঠিকানা। সরেজমিন গিয়ে ইট, বালি, সিমেন্টসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম তিনি জব্দ করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর শিগগির অভিযান শুরু করবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক নুরুল্লা নূরী বলেন, পাহাড় দখল করতে যত অভিনব পদ্ধতিই ব্যবহার করা হোক না কেন কেউই পার পাবে না। ভূমি অফিস থেকে অবহিত হয়ে তারা এরই মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি সরেজমিন প্রকৃত দখলদারদের তথ্য সংগ্রহ করছেন। এরপর অভিযুক্তদের শুনানিতে ডেকে জরিমানা করা হবে। পরিচালনা করা হবে উচ্ছেদ অভিযানও।
স্থানীয়রা জানায়, জঙ্গল সলিমপুর মৌজার ৩৬১, ৩৫৯, ৩৫৭-৩৫৮, উত্তর পাহাড়তলী মৌজার ৭৭৩-৭৭৪, ৩০১, ২০০, ১৯৮, ১৩৯, ১৯৫, ১৮৭ এবং জঙ্গল লতিফপুর মৌজার ৬২, ৬০-৬২ ও ৩৪ নং দাগের পাহাড়েই সবচেয়ে বেশি নতুন ঘর তৈরি করছে দখলদাররা। করোনার কারণে দীর্ঘ ছুটিকেই দখলের উপযুক্ত সময় মনে করেছে তারা। তবে এসব দাগের বাইরেও এখন নতুন করে দখল করা হচ্ছে পাহাড়। জমির, মনির ও নাছির নামের স্থানীয় তিন প্রভাবশালী আড়ালে থেকে পাহাড় দখলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আরেকটি সিন্ডিকেটে আছে জহিরুল, লিটন, রহমান ও রুবেল। তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। তবে তাদের বিস্তারিত পরিচয় জানাতে পারেনি স্থানীয়দের কেউই।
সরেজমিন দেখা যায়, বায়েজিদ থেকে নতুন সংযোগ সড়ক হয়ে ফৌজদারহাটের দিকে আসতেই পাহাড় কেটে একটি স্থানে গড়ে তোলা হচ্ছে সেমিপাকা ঘর। প্রশাসনের লোককে পাহারা দিতে এই ঘরের আধা কিলোমিটারের মধ্যে ছদ্মবেশে পাহারায় থাকে আরও অন্তত চার থেকে পাঁচজন যুবক। ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী এই যুবকরা নতুন আগন্তুক দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে তা জানিয়ে দেয় ঘর তৈরির কাজে থাকা ব্যক্তিদের। জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম এই সেমিপাকা ঘরে প্রবেশের আগেই পৌঁছে যায় খবর। তাই তিনি হাতেনাতে ধরতে পারেননি কাউকে। তবে ইট. বালি, সিমেন্ট জব্দ করে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে এভাবে পাহারা দিয়ে তারা এরই মধ্যে ৪০ ফুট বাই ৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি সেমিপাকা ঘরের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে। চারপাশে ইটের ঘেরা দিয়ে ওপরে দিয়েছে নতুন টিন। লাগিয়েছে শাটারও। এটিকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এজন্য এই ঘরের লাগোয়া পাহাড়ও দিনদুপুরে কাটতে থাকে তারা। এরই মধ্যে পাহাড়ের এক-তৃতীয়াংশ কেটেও ফেলেছে তারা। কাটা এই স্থান ঢাকতে রোপণ করেছে তারা কলাগাছ। তাদের ধারণা এই কলাগাছ ঠেকাবে পাহাড়ধসও।
এটির অদূরে আরেকটি পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে বেশ কয়েকটি বসতঘর। এরই মধ্যে কয়েকটি ঘর তুলে তা ভাড়াও দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে তারা বসতঘরের বাইরে ঝুলিয়েছে সাইনবোর্ড। এতে লেখা 'ইছাপুরিয়া মোনয়োজীয়া সুফী মিজান মাদ্রাসা, হেফজখানা ও এতিমখানা'। পিএইচপি গ্রুপের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছে বলে সাইনবোর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ পিএইচপি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা পাহাড় কেটে কোথাও কোনো মাদ্রাসা করছেন না বলে জানান। তাদের নাম ব্যবহার করে দখলদাররা অপকর্ম করছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রুপের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম
- পাহাড়
- পাহাড় সাবার