ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেহেরপুরে অপচিকিৎসা

ভণ্ড কবিরাজের ফাঁদ

ভণ্ড কবিরাজের ফাঁদ
×

মেহেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১০ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০১৯ | ২১:৪৩

মেহেরপুর সদর উপজেলার হিজুলি গ্রামে রোগীর বাড়ির পাশেই একটি আমবাগানে শামিয়ানা টানিয়ে বসানো হয়েছে আসর। সেখানে গেল কয়েকদিন ধরে ওই রোগীর অন্ধত্ব সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন রাজশাহী থেকে আসা এক কবিরাজ। অদ্ভুত ধরনের এই চিকিৎসাসেবা দেখতে ভিড়ও জমিয়েছে হাজারো মানুষ। জিন হাজির করে চিকিৎসার কথা বলা হচ্ছে। এ জন্য ক্ষণে ক্ষণে চলছে গান, অভিনয় আর ঝাড়ফুঁক। একই সঙ্গে রোগীর জন্য দোয়া করা হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে তাবিজ ও নানা ভেষজ ওষুধ। দুপুর থেকে রাত অবধি চলে চিকিৎসার নামে এই অপচিকিৎসা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সরেজমিন দেখা যায়, চিকিৎসার ওই আসর ঘিরে ব্যাপক লোকসমাগম হওয়ায় এর আশপাশে জিলাপি, পেঁয়াজুসহ চা-বিস্কুটের দোকানও বসেছে। জিন ও সাপের বিষয় ভেবে স্থানীয় অনেকেই এই চিকিৎসায় আস্থা রাখার কথা জানালেও ইসলামী চিন্তাবিদ ও চিকিৎসকরা বলছেন এর কোনো ভিত্তি নেই। দ্রুতই এসব কবিরাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

আরও দেখা গেল আসরের পাশে বসে আছেন সম্প্রতি অন্ধ হয়ে যাওয়া একজনকে। সামনে বাজনার তালে তালে নেচে গেয়ে ফণা তুলে জিন হাজির করার চেষ্টা করছেন কবিরাজ। পাশেই একটি পাত্রে ধূপের আগুন। জিন আসার পরই মাটিতে পোঁতা কয়েকটি কলাগাছ সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কয়েকজন অবিবাহিত যুবককে। অবশেষে জিন ধরা পড়ার কথা জানিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন কবিরাজ।

কিছুক্ষণ পর জ্ঞান হারালেন। কয়েক মিনিটের পরিচর্যায় আবার সুস্থও হয়ে গেলেন তিনি। ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে যাওয়া হলো রোগীকে। এভাবেই চিকিৎসা দিয়ে আসছেন ওই কবিরাজ।

কবিরাজ আসাদুল হক জানান, তিনি পবিত্র কোরআন তরজমা করে চিকিৎসা দিচ্ছেন। কোরআনের আলোকেই ভেষজ ওষুধ ও দোয়া কালাম পড়ে ফুঁক দিচ্ছেন। ঝাপান গান ও মনসা দেবীর পূজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এটা রোগী স্বপ্নে দেখেছেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে রোগীর পরিবার গানের আয়োজন করেছে।

অন্ধত্ব দূর হবে কিনা এ বিষয়ে কবিরাজ বলেন, এটা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি আল্লাহর কালাম তরজমা করে চিকিৎসা দিচ্ছেন বিধায় রোগীর অন্ধত্ব দূর হবে বলে আশা করেন। এমন চিকিৎসায় রোগী সুস্থ হতে অন্তত দুই থেকে তিন মাস লেগে যেতে পারে বলে জানান।

রোগীর স্বামী আব্দুল মাবুদ বলেন, বছর দুই আগে তাদের গোয়ালঘরে ২৭টি সাপের বাচ্চাসহ সাপ মারা হয়। তার কয়েক মাস পরই তার স্ত্রীর মাথায় ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে। মাথার চুলে সাপের ফণার জটা বাঁধে। নানা জায়গায় চিকিৎসা নিয়ে প্রতিকার মেলেনি। চিকিৎসক ও কবিরাজের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরও দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায় স্ত্রী পুরাতন নেছার। গায়েবিভাবে স্বপ্নাদেশ পান- তাকে কবিরাজের মাধ্যমে চিকিৎসা করাতে হবে। সেই সঙ্গে ঝাপান গানসহ মনসা দেবীর পূজা দিলেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। খুঁজতে থাকেন কবিরাজ। খোঁজাখুঁজির পর রাজশাহীর ওই কবিরাজের শরণাপন্ন হন তিনি। কবিরাজ জানান, জিনে তার দুই চোখের পর্দা ঢেকে দিয়েছে। রোগী ভালো করতে হলে কোরআনের আলোকে চিকিৎসাসহ বেহুলা লখিন্দরের পালাগানের আয়োজন করতে হবে। কবিরাজের পরামর্শ মতো ঝাপান গানসহ জিন দিয়ে চিকিৎসা করানোর আয়োজন করা হয়।

প্রতিবেশি সাহাবুদ্দিন জানান, যে পদ্ধতিতে চিকিৎসা হচ্ছে তাতে তাদের বিশ্বাস নেই। আধুনিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেওয়াই জরুরি।

পূরাতন নেছার মেয়ে মর্জিনা খাতুন বলেন, দেশে কত ডাক্তার দেখালাম রোগী ভালো হলো না। ডাক্তার হাল ছেড়ে দিয়েছেন। বাবা স্বপ্নে আদেশ পেয়ে মায়ের এই চিকিৎসা করাচ্ছেন। আমাদের আশা- বাড়ি থেকে জিন চলে গেলে মা সুস্থ হয়ে যাবে।

মেহেরপুর সরকারি হাইস্কুলের ইসলাম ধর্মের শিক্ষক মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গানবাজনা, জিন হাজির করা, তাবিজ-কবজ করে চিকিৎসা করা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

মেহেরপুরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. অলোক কুমার দাস বলেন, এটি চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা। চিকিৎসার নামে প্রতারণা বন্ধে প্রতারকদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন

×