বিপন্ন প্রত্নতত্ত্ব
ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি
সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১২
ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় মোগল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যেসব
শাসক যুদ্ধ করেছিলেন, সেই 'বারোভূঁইয়া'দের অন্যতম ছিলেন মসনদে-আলা বীর ঈশা
খাঁ। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার
নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত জঙ্গলবাড়ি দুর্গ।
এটি ছিল মূলত তার দ্বিতীয় রাজধানী। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এ দুর্গটি
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি স্থাপনা হলেও প্রকৃত
সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ভাটির রাজাখ্যাত ঈশা
খাঁর জঙ্গলবাড়ি।
বাংলা সালতানাতের শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খান কররানী ১৫৭৬ সালে মোগল
রাজশক্তির হাতে পরাস্ত ও নিহত হন। তারপর ১৬১২ সাল পর্যন্ত বাংলার
স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য অনবরত সংগ্রাম করেন বাংলার বারো ভূঁইয়াখ্যাত
শাসকরা। পশ্চিমে ইছামতী নদী, দক্ষিণে গঙ্গা (পদ্মা) নদী, পূর্বে ত্রিপুরা
রাজ্য এবং উত্তরে বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ সিলেটের বানিয়াচং পর্যন্ত সুবিস্তৃত
বাংলায় মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একাট্টা ছিলেন এই বারো ভূস্বামী। মোগল
ঐতিহাসিক আবুল ফজল এবং মির্জা নাথান তাদের 'দাওয়াজদাহ বুমি' অর্থাৎ 'বারো
ভূঁইয়া' নামে অভিহিত করেছেন। ভাটি বাংলার সেই বারোভূঁইয়াদের অগ্রণী ঈশা খাঁ
ছিলেন অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলা, ঢাকা ও কুমিল্লার অধিকাংশ অঞ্চল, নোয়াখালী,
ফরিদপুর, পাবনা ও রংপুর জেলার কিয়দংশ এবং সিলেট জেলার পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে
গঠিত এক বিশাল রাজ্যের স্বাধীন অধিপতি। আবুল ফজলের মতে, ঈশা খাঁ ছিলেন
'মর্জুবানে ভাটি' অর্থাৎ ভাটির রাজা।
ভাটির রাজা ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী ছিল জঙ্গলবাড়ি। বর্তমানে যা
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার কাদিরজঙ্গল ইউনিয়নে ঈশা খাঁর দুর্গ নামে
পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, বাংলার বারোভূঁইয়াদের অবিসংবাদিত নেতা ঈশা খাঁর
রাজধানী ছিল সোনারগাঁয়ে। মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি সুবেদার মানসিংহের
সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সোনারগাঁ থেকে তিনি ব্রহ্মপুত্র ও শঙ্খ নদীর
তীরবর্তী কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলাধীন এগারসিন্দুরে আশ্রয় নেন। সেখানে
ফের যুদ্ধে তিনি মানসিংহকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে
যায়। তার পরও তাকে হত্যা করা হয়নি। এ ঘটনার পর ঈশা খাঁ লক্ষ্মণ সিং হাজরা
নামে এক কোচ রাজার দখলে থাকা জঙ্গলবাড়ি দুর্গ আক্রমণ করে তা হস্তগত করেন
এবং সেখানেই তিনি তার রাজধানী স্থানান্তর করেন।
অনেকেই মনে করেন, লক্ষ্মণ সিং হাজরা ও ঈশা খাঁ দু'জনের কেউই জঙ্গলবাড়ি
দুর্গটির মূল নির্মাতা নন। দুর্গ এলাকার বাইরে বিশেষ করে দুর্গের
দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম অংশে অসংখ্য ইটের টুকরো ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ
রয়েছে। প্রাপ্ত নিদর্শনাবলি সম্ভবত প্রাক-মুসলিম আমলের এবং এটি ছিল একটি
সমৃদ্ধিশালী জনবসতি কেন্দ্র। তবে দুর্গের ভেতরে বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে ঈশা
খাঁর। এখনও টিকে আছে তার বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ।
জঙ্গলবাড়ি দুর্গের মূল ভবনটির ছাদ ধসে গেলেও দরবার কক্ষের অনেকটাই টিকে আছে
এখনও। দরবার-সংলগ্ন পান্থশালায় এখনও ১০-১২টি করে কক্ষের অস্তিত্ব দেখা
যায়। পান্থশালার ধার ঘেঁষে চলে গেছে প্রাচীর। প্রাচীরের মাঝে মাঝে ফটক। ফটক
ধরে ভেতরে গেলেই চোখে পড়ে বিধ্বস্ত অন্দরমহল। দেয়ালে ফুল ও লতাপাতার
আলপনা। কয়েকটি থামও অক্ষত আছে। থামের গায়ে আছে লতাপাতার নকশা। দুর্গের
চারদিক প্রমাণ করে, এটি ছিল বৃত্তাকার আকৃতির। দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর দিকে
গভীর পরিখা খনন করা এবং পূর্বদিকে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা
হয়। বাড়ির সামনে রয়েছে সেই আমলের খনন করা একটি দীঘি। পাশেই রয়েছে মসজিদ।
ধারণা করা হয়, ঈশা খাঁর হাতেই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। মসজিদের কাছে ঈশা
খাঁর বংশধরদের বাঁধানো কবর রয়েছে।
ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়িতে অবস্থান করে শাসন করতেন তার ২২টি পরগনা। এখানে অবস্থান
করেই তিনি ফের সোনারগাঁ দখল করে সেখানে আবার রাজধানী স্থাপন করেন। আর তখন
থেকেই জৌলুস হারাতে থাকে জঙ্গলবাড়ি।
ষোড়শ শতকের বীর ঈশা খাঁ প্রতিষ্ঠিত ৪০ একর আয়তনের জঙ্গলবাড়ি দুর্গ আজ প্রায়
বিলুপ্তির পথে। অযত্ন-অবহেলা ও সংস্কারবিহীন ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এ
নিদর্শনটি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভগ্নস্তূপের মাঝেও জঙ্গলবাড়িতে সাড়ে
৪০০ বছরের স্মৃতি আজও টিকে রয়েছে, যা বাঙালির অতীত শৌর্য-বীর্যের স্বাক্ষর
বহন করে।
ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি দুর্গের একটি দরবার হল সংস্কার করে বছরখানেক আগে
স্থানীয় প্রশাসন সেখানে স্থাপন করেছে 'ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর'। সেখানে
রয়েছে ঈশা খাঁর বিভিন্ন ছবি, তার বংশধরদের তালিকা এবং বিভিন্ন নিদর্শন।
এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা বলছেন, বীর ঈশা খাঁ বাংলার গৌরব। শৌর্য,
বীর্য ও বাঙালির স্বাধীনতার প্রতীক তিনি। তার স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারের
দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি দল
জঙ্গলবাড়ি ঈশা খাঁ দুর্গ পরিদর্শন করেন। কিশোরগঞ্জে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের
কর্মী মো. আমিনুল ইসলাম সাদী জানান, শিগগিরই দুর্গটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের
আওতায় আনা হবে।
- বিষয় :
- ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি