ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

করোনাকাল

তারুণ্যের শক্তিতে স্বস্তি

তারুণ্যের শক্তিতে স্বস্তি
×

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটায় স্থানীয়দের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করা তরুণেরা -সমকাল

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১৫:৪৯

চরপাথরঘাটা। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার সাধারণ একটি ইউনিয়ন। ৫০ হাজার মানুষের এই ইউনিয়নে নেই কোনো সরকারি হাসপাতাল। নেই কোনো আইসিইউ। নেই কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডারও। এই উপজেলায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ২৩ কিলোমিটার দূরের পাশের উপজেলা পটিয়া কিংবা ১০ কিলোমিটার দূরের আনোয়ারায় নিয়ে যেতে হতো। কিন্তু ১৩ সামাজিক সংগঠনের শতাধিক তরুণ সম্মিলিত শক্তিতে এখন পাল্টে দিয়েছেন সব। তাইতো করোনার এই দুঃসময়ে চরপাথরঘাটায় নেই ডাক্তার, ওষুধ ও অক্সিজেনের হাহাকার। নেই অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ছোটাছুটিও। কেউ অসুস্থ হলে তারা ছুটে যাচ্ছেন চিকিৎসকসহ। যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স। হচ্ছে পরীক্ষা। প্রয়োজন হলে দিচ্ছেন অক্সিজেন। রোগীর ঘরে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে ওষুধ কিংবা খাবারও। দুঃসময়ে তরুণরা এভাবে পাশে দাঁড়ানোয় এখন আর নিজেদের অসহায় ভাবেন না চরপাথরঘাটার বাসিন্দারা। উল্টো তারা গর্বিত হন যখন দেখেন আশপাশের আরও চারটি ইউনিয়নের তরুণরা করোনাকে জয় করতে এক হওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের মতো!

কর্ণফুলী উপজেলার স্বীকৃতি পেয়েছে মাত্র চার বছর আগে। এখানে ছোট-বড় প্রায় ৬০টি শিল্পকারখানা থাকলেও অবকাঠামোগত স্থাপনা গড়ে ওঠেনি চাহিদামতো। এই অপ্রাপ্তিকেই শক্তিতে পরিণত করতে এগিয়ে এসেছেন চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের তরুণরা। পুরো ইউনিয়নকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনতে তারা গঠন করেছেন 'চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন সমন্বয় পরিষদ'। এই পরিষদের আহ্বায়ক ও ডায়মন্ড সিমেন্টের পরিচালক লায়ন হাকিম আলী বলেন, আমাদের সকল শক্তির উৎস তরুণরা। তাদের সম্মিলিত শক্তিই আমাদের মনোবল বাড়াচ্ছে। ফান্ড গঠন করে পুরো ইউনিয়নে আমরা সব অসুস্থ রোগীর জন্য চাহিদামতো অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন ও ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করছি। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসছে। ১৯ জুন আমরা আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে মাত্র ১১ দিনে ১২ লাখ টাকার ফান্ড পেয়েছি। তাই ৯টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে রাখা হয়েছে ডায়াবেটিস মেশিন, জ্বর মাপার থার্মোমিটার ও রক্তচাপ মাপার যন্ত্রসহ যাবতীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম। নমুনা নেওয়ার সুবিধার্থে ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে সুরক্ষা বুথ। বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে গুরুতর অসুস্থ রোগীর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে শয্যা। সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সরফরাজ খানের পরামর্শ নিয়ে আমরা সুস্থ করতে ভূমিকা রাখছি- কভিড, নন কভিড সব রোগীকেই।

চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাবের আহমেদ জানান, তারুণ্যের শক্তি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় করোনাও সেভাবে হানা দিতে পারেনি এই ইউনিয়নে। পুরো চট্টগ্রাম করোনার রেড জোন হলেও আড়াই লাখ জনসংখ্যার কর্ণফুলী উপজেলায় এখন করোনা রোগী আছেন মাত্র একজন। করোনা আক্রান্ত হয়ে এক রোগী মারা গেলেও এখানে সুস্থ হয়েছেন পাঁচজন। চর পাথরঘাটার এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পাশের শিকলবাহা ও চরলক্ষা ইউনিয়নের তরুণরাও গঠন করেছে কমিটি। গঠন করছে ফান্ডও।

পুরো ইউনিয়নের মনোবল চাঙ্গা রাখার কৌশল সম্পর্কে সমন্বয় পরিষদের সদস্য সচিব ও কর্ণফুলী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম হক বলেন, জনগণকে সেবা ও সাহস দিতে স্বাস্থ্য, প্রচার ও ত্রাণ বিষয়ে তিনটি উপকমিটি গঠন করেছি। প্রতিটি উপকমিটিতে সদস্য রাখা হয়েছে ২৭ জন। ১৩ সামাজিক সংগঠনের সদস্যরাই এই উপকমিটির প্রাণ। উপকমিটিকে মনিটরিং করছে আমাদের ১৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি। আবার আহ্বায়ক কমিটিকে মনিটরিং করছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। এলাকাবাসী যে কোনো প্রয়োজনে তাদের ছয়টি হটলাইন নম্বরেও যোগাযোগ করতে পারছে বলে জানান তিনি।

এলাকাবাসীর দুঃসময়ে আশার আলো জ্বালানো এই সংগঠনগুলো হচ্ছে- জাগরণী সংঘ, দুরন্ত দুর্বার, ইছানগর যুবসংঘ, মুক্তবিহঙ্গ, শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদ, ইছানগর প্রভাতী সংঘ, বিডিক্লিন, রেডক্রিসেন্ট, প্রতিভা সংসদ, সবুজ সংঘ, প্রতিধ্বনি, পশ্চিম ইছানগর তরুণ সংঘ, পূর্বপাড়া নবীন সংঘ, প্রগতি সংঘ ও লায়ন স্টার ক্লাব। স্বাস্থ্য, প্রচার ও ত্রাণবিষয়ক উপকমিটিতে আছেন এসব সংগঠনের সদস্যরাই। তাদের তৎপরতার কারণেই চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা এসএম পেয়ার আলীর মা সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স ও অক্সিজেন সাপোর্ট পেয়ে সুস্থ হয়েছেন। ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা অসহায় বাচুনি খাতুনও করোনার এই আকালে সুন্দরভাবে জন্ম দিয়েছেন তার কন্যা সন্তান।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সমন্বয় পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী ইসলাম আহমেদ বলেন, সেবার পাশাপাশি রোগীদের এখন দরকার মানসিক সাপোর্ট। আমরা নজর দিয়েছি এটিতেই।

আরও পড়ুন

×