ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

খলিসা ডাঙ্গায় ড্যাম নির্মাণ নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা

খলিসা ডাঙ্গায় ড্যাম নির্মাণ নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা
×

খলিসা ডাঙ্গা নদীতে নির্মাণাধীন হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম। সম্প্রতি নাটোরের লালপুর উপজেলার নান্দ বাজার এলাকায় সমকাল

মো. আশিকুর রহমান, লালপুর (নাটোর)

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫ | ২৩:৩১

নাটোরের লালপুরে খলিসা ডাঙ্গা নদীতে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে নদীটি নাব্য হারাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিএমডিএ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শুকনো মৌসুমে সেচের জন্য নদীটির প্রায় ছয় কিলোমিটার অংশে ২ লাখ ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের জন্য এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, প্রকল্পটি নদীর উজানের (পশ্চিমে) কৃষকদের জন্য সুবিধা আনলেও এতে ভাটির (পূর্বে) কৃষকরা পানিশূন্যতায় ভুগবেন। সাময়িক সুবিধার জন্য প্রকল্পটি নদীর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করবে। 
বিএমডিএ নাটোর জোন সূত্রে জানা গেছে, জেলার সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে লালপুরের ওয়ালিয়া ইউনিয়নের নান্দ বাজার এলাকায় খলিসা ডাঙ্গা নদীতে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম বসানোর প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুপারস্টার রিনিওভাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের কাজটি শেষ করার কথা ছিল। ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এটি নির্মিত হলে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে ৪০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া যাবে। এতে ১২০০ থেকে ১৩০০ কৃষক উপকৃত হবেন। 
যেসব কৃষক উপকৃত হবেন, তাদের সবাই ড্যামের উজানের (পশ্চিমে) বাসিন্দা। এ তথ্য জানিয়ে ভাটির গ্রাম ময়না মণ্ডল পাড়ার কৃষক গেদন আলী বলেন, তাঁর জমি আছে প্রায় দুই 
বিঘা। ড্যামটি নির্মিত হলে খরা মৌসুমে তাঁর 
মতো শত শত কৃষক সংকটে পড়বেন। কেউই সেচ দিতে পারবেন না। এমনকি পাট জাগও দিতে পারবেন না। 
একই এলাকার কৃষক ইউনুস আলীর জমি আছে বিঘা পাঁচেক। তিনি বলেন, এই ড্যাম নির্মিত হলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। নদীটি মরে যাবে। এমনকি নদীর উত্তর পাশের ময়না ও দক্ষিণ পাশের নান্দ গ্রামের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র সেতুটিও ভাঙনঝুঁকিতে পড়বে। 
ময়না পূর্বপাড়ার সাইদুল ইসলামের ভাষ্য, খলিসা ডাঙ্গা নদী দিয়ে আগে বড় বড় নৌকা গেছে, অনেক মাছ হতো। মাঝে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে নদীটি মরে গিয়েছিল। একবার টাকা খরচ করে খনন করা হয়েছে। এখন নদীকে মারতে ড্যাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে তাঁর তিন বিঘা জমিতে শুকনো মৌসুমে সেচ দিতে পারবেন না। 
এই কৃষকের কথার সঙ্গে একমত বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নেতারা। তাদের ভাষ্য, নদীতে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম বসানো ভুল সিদ্ধান্ত। এটি নদীকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে। নদী বা খালে বাঁধ, ড্যাম, স্লুইসগেট নির্মিত হলে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, নাব্য হারায়।
বাপার কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, যে নদীকে বাঁচাতে কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হলো, সেই নদীতে আবার কেন কোটি টাকা ব্যয়ে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম বসানো হবে? এ প্রকল্পের বিনিময়ে হয়তো কারও পকেট ভারী হবে। এ ছাড়া কিছুই হবে না। এতে রাষ্ট্রের টাকার অপচয় ছাড়া কিছুই হবে না বলেও মনে করেন তিনি। 
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিফাত করিম বলেন, ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ খলিসা ডাঙ্গা নদীটি 
রাজশাহীর বাজুবাঘা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এটি লালপুরের মধ্য দিয়ে পাবনা-চাটমোহরের চিকনাই নদীতে পড়েছে। 
তবে খলিসা ডাঙ্গাকে নদী হিসেবে মানতে রাজি নন বিএমডিএ নাটোর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন। তাদের কাছে এটি খাল হিসেবে চিহ্নিত। আনোয়ার হোসেন বলেন, হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যামটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির। সব দিক জরিপ করেই সরকার এ প্রকল্প অনুমোদন করছে। তিনি মনে করেন, এই ড্যাম না হলেই বরং ক্ষতি হতো। কারণ যখন নদীতে পানি বাড়বে, তখন এই ড্যামের প্লেট নিচে নামিয়ে রাখা হবে। ফলে নদীর ভাটিতে বা ব্রিজে কোনো ক্ষতি হবে না। তার পরও সুবিধা পেতে গেলে কিছু অসুবিধা হবেই। 
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে প্রকল্পের পরিচালক সুমন্ত কুমার বাসাকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মেসেজ পাঠালেও উত্তর দেননি তিনি। বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মো. আনোয়ার সাদত বলেন, এই ড্যাম নির্মাণে সাময়িক কিছু সুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে। যে কোনো নদীতে ড্যাম বা বাঁধ নির্মাণ মানেই নদীকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া।
 

আরও পড়ুন

×