গোপালগঞ্জ
আতঙ্ক অস্বস্তির অবসান চায় সাধারণ মানুষ
ফাইল ছবি
মনোজ সাহা, গোপালগঞ্জ
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৫ | ০১:২৬ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৫ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
টানা কারফিউয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে গোপালগঞ্জের মানুষের জীবনযাত্রা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিপাকে পড়েছে দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল বিশাল জনগোষ্ঠী। কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষও ঘরবন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠেছেন। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। সবাই এখন চাইছেন, তিন দিনের আতঙ্ক-অস্বস্তির এই পরিবেশ বদলে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুক জনজীবন।
গত বুধবার এনসিপির সভাস্থল, গাড়িবহরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের হামলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে হতাহতের পর ওই দিন রাত ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে জেলা প্রশাসন। টানা ২২ ঘণ্টার কারফিউ শেষে ফের বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত কারফিউ দেওয়া হয়। গতকাল বেলা ১১টা থেকে ৭ ঘণ্টা অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল।
এ সময় গোপালগঞ্জ শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত লঞ্চ ঘাটসংলগ্ন রাস্তায় ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও টেম্পো চলাচল করতে দেখা গেছে। সড়কে ছিল কিছু প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল। জরুরি প্রয়োজনে অনেকে বের হয়েছেন। মূল সড়কের পাশে গলির ভেতর কিছু দোকানপাট খোলে। তবে বিপণিবিতানগুলো বন্ধ ছিল। বাজারের বেশির ভাগ দোকান খোলেনি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ী, দিনমজুর, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে আজ শনিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত আবারও কারফিউ জারি করে প্রশাসন। এর মধ্যে যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে। এতে জেলাবাসীর মধ্যে চাপা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় কথা হয় গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী স্বর্ণা রায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তিন দিন ধরে ঘরের বইরে আসতে পারিনি। দম আটকে আসছিল। দুপুরে বের হয়েছি। এখন শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা লঞ্চঘাটে দেখছি যানবাহন নেই।
অথচ এখানে প্রতিদিন যানজট লেগে থাকে। একটা অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ রাস্তায় বের হওয়ার সময় মা-বাবা বারবার ফোন করে সাবধানে চলাফেরা করতে বলেছেন। আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে চাই।’
গোপালগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী শ্যামলী রায়। বিকেল ৩টার দিকে তার সঙ্গে কথা হয় লঞ্চঘাট ব্রিজের ওপর। সে জানায়, গত তিন দিনের কারফিউতে কলেজ, কোচিং বা প্রাইভেট পড়তে যেতে পারছে না। এতে পড়ালেখার ক্ষতি হচ্ছে।
ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চলে ইমরান মুন্সির (৫২)। তাঁর সঙ্গে শহরের সরকারি কলেজ মসজিদ রোডে কথা হয় বিকেল পৌনে ৪টার দিকে। তিনি বলেন, ‘ঝালমুড়ি বিক্রি করে আমাদের ৬ জনের সংসার চলে। ৪ ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলে ঢাকা ও ছোট ছেলে মানিকগঞ্জে মাদ্রাসায় পড়ে। কারফিউর কারণে বেচাকেনা নেই; যা বিক্রি করি তা দিয়ে সদাই কিনতে পারছি না। খুব কষ্টে দিন কাটছে।’
দুপুরের তপ্ত রোদে গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে কুলফি আইসক্রিম বিক্রি করছিলেন বিল্লাল হোসেন (৫৫)। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি কুষ্টিয়া। আমি গোপালগঞ্জে কুলফি আইসক্রিম তৈরি করে বিক্রি করি। তিন দিন পর আজ আইসক্রিম নিয়ে বের হয়েছি। আইসক্রিম কেনার লোক নেই। আমি দিন আনি দিন খাই। এক দিন আয় না হলে খাওয়া জোটে না। দিনের মধ্যে আইসক্রিম বিক্রি করতে না পারলে সব গলে নষ্ট হয়ে যাবে। অনেক টাকা লোকসান হবে।’
মহিলা কলেজের সামনে দুপুর দেড়টার দিকে কথা হয় রিকশাচালক মাহফুজ কাজীর (৫০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভাড়ার রিকশা চালাই। এ আয় দিয়ে পাঁচজনের সংসার চলে। কারফিউ থাকায় যাত্রী পাই না। সংসার চালাতে পারছি না। আমি এ অবস্থা চাই না।’
শহরের পুরোনো সোনালী ব্যাংক ভবনসংলগ্ন হটকেক শপের পরিচালক নোমান মোল্লা বলেন, ‘তিন দিন পর দোকান খুলেছি। কোনো কেনাবেচা নেই। আয় কমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসতে হবে। আমরা হানাহানি-মারামারি চাই না। কারফিউ চাই না। শান্তি চাই। নিরিবিলি ব্যবসা করতে চাই।’
এইচএসসি পরীক্ষার্থী সাইমা বিনতে মাহবুবের সঙ্গে সন্ধ্যা ৬টায় কথা হয় তাদের শহরের থানাপাড়ার বাড়িতে। এ পরীক্ষার্থী বলে, ‘কারফিউর কারণে গত বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। কারফিউ বজায় থাকলে সামনের পরীক্ষাও স্থগিতের শঙ্কা রয়েছে। বোর্ডের রুটিনে বাকি পরীক্ষা দিতে চাই।’
সাইমার মা হালিমা রহমান সমকালকে বলেন, ‘পরীক্ষা পেছানোয় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষা বাড়ে। পরীক্ষার ধারাবাহিকতা না থাকলে মেয়ের মনোসংযোগে ঘাটতি এবং পরীক্ষার ফলে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা থাকে।’
ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ফল-সবজির মতো কাঁচা পণ্যের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মহাবিপাকে। দোকান বন্ধ থাকায় তাদের পণ্য পচে যাচ্ছে।
বেলা সাড়ে ১১টায় লঞ্চঘাট এলাকার ফল ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কারফিউয়ে দোকান খুলতে না পারায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছি। তিন দিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ফল পচে গেছে। আজ তিন ঘণ্টার জন্য দোকান খুলেছি। এই সময়ে আর কতটুকু বিক্রি করা যায়। বাকি ফলগুলোও পচে যাবে। আমরা চাই দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসুক।’
গোপালগঞ্জ শহরের বড় বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম। বিকেলে সাড়ে ৫টায় তাঁর সবজির দোকানে বসে বলেন, ‘বুধবার থেকে দুই দিন দোকান বন্ধ ছিল। শুক্রবার খুলে দেখি অনেক সবজিতে পচন ধরেছে। এতে অন্তত ১০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ অবস্থা চললে দোকান লাটে উঠবে।’
গোপালগঞ্জের সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫
গোপালগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ রমজান মুন্সি (৩৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে।
গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ২টার দিকে মারা যান তিনি। রমজান মুন্সি শহরের থানাপাড়ার মৃত আকবর আলী মুন্সির ছেলে। নিহত রমজান মুন্সির ভাই জামাল মুন্সি জানান, তাঁর ভাই রিকশা চালাতেন। বুধবারের সংঘর্ষের সময় তিনি এক যাত্রীকে পৌঁছে দিতে রিকশা নিয়ে লঞ্চঘাট এলাকায় যান। তখন সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
রমজান কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন জামাল। তিনি ভাই হত্যার বিচার চেয়ে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গোপালগঞ্জে নিয়ে এসেছি।
গোপালগঞ্জ আড়াইশ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে রমজান মুন্সি বুধবার বিকেলে আমাদের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। তাই তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
নদীপথে টহল জোরদার
এনসিপির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতরা যাতে নৌপথে পালাতে না পারে, সেজন্য গোপালগঞ্জের নদীপথে টহল জোরদার করেছে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। কোস্টগার্ডের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সন্দেহভাজন নৌযানগুলোতে তল্লাশি, যাত্রীর পরিচয় যাচাই ও সন্দেহভাজন গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- এনসিপি
- জাতীয় নাগরিক পার্টি
- গোপালগঞ্জ
- কারফিউ
