বাবার ছবি জড়িয়ে অবুঝ আবিরের ‘বাবা’ ডাক
মায়ের সঙ্গে শহীদ পিতা রিপনের ছবি দেখছে অবুঝ শিশু আবির চন্দ্র শীল সমকাল
রাসেল চৌধুরী, হবিগঞ্জ
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৪০
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হবিগঞ্জ শহরের অনন্তপুর এলাকার বাসিন্দা রিপন চন্দ্র শীলের পরিবারটি অভাব-অনটনে নিঃস্ব। ১৫ মাসের ছোট শিশুকে নিয়ে ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম রিপন চন্দ্র শীলকে হারিয়ে পরিবারটি ধুঁকছে। ১৫ মাসের ছোট্ট শিশু, বৃদ্ধ শাশুড়ি ও অসুস্থ দেবরকে নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন স্ত্রী তুষ্টি চন্দ্র শীল।
৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি ও ছাত্র-জনতার সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় হবিগঞ্জ শহর। বিকেলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র-জনতা যখন মুখোমুখি, ঠিক তখনই গুলিবিদ্ধ হন হবিগঞ্জ শহরের অনন্তপুরের বাসিন্দা ছাত্রদল নেতা রিপন চন্দ্র শীল। সঙ্গে সঙ্গে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হলে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। তাঁর এ মৃত্যুর খবরে পরিবারে নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া।
রিপন যখন শহীদ হন, তখন তাঁর ছেলের বয়স মাত্র তিন মাস। সন্তানের মুখে বাবা ডাক শোনার ইচ্ছে পূরণ হয়নি রিপনের। তবে এখন তাঁর ছবি দেখে ‘বাবা’, ‘বাবা’ ডাকে দেড় বছরের শিশু আবির চন্দ্র শীল। অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তুষ্টি। একমাত্র শিশু সন্তান আবিরকে নিয়ে কঠিন লড়াইয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।
তুষ্টি রানী বলেন, অল্প বয়সেই রিপনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ঠিকমতো সংসার বোঝার আগেই তিনি চলে গেছেন। ছেলে বাবাকে দেখতে পারেনি। তার মুখ থেকে ‘বাবা’ ডাক ফোটার আগেই বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। যারা তাঁর ছেলেকে বাবাহারা করেছে, তাদের যেন বিচার হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এখন সন্তান ও পরিবারের লোকজনকে নিয়ে কোনোভাবে জীবনযাপন করছি। আর্থিক সংকটে পড়েছি। সরকার ও স্থানীয়ভাবে যে সহযোগিতা পেয়েছি, তা ঋণ পরিশোধ ও সংসারের অন্যান্য কাজে ব্যয় করেছি। সংসার চালাতে হলে এখন আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’
একমাত্র বড় বোন চম্পা রানী বিশ্বাস ছোট ভাই রিপনকে হারিয়ে প্রায় সময়ই কাঁদেন। দুই ভাইবোনের মধ্যে খুবই মধুর সম্পর্ক ছিল বলে জানান তিনি। বাসায় নতুন কিছু রান্না করা হলেই একসঙ্গে খেতে বসতেন তারা। তিনি বলেন, ‘৪ আগস্ট সকাল থেকেই খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল রিপন। পরে পেট ভরে খেয়েছে। আমি আশ্চর্য হলাম। এটাই যে ভাইয়ের শেষ খাবার, তা বুঝতে পারিনি। খাবার শেষে তাকে বারবার সাবধান করছিলাম, ঘর থেকে বের হবি না। কিন্তু মিছিলে চলে গেল।’
সন্তানের কথা মনে হলে এখনও কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ মা রুবী রানী শীল। সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তিনি। কথা বলতে পারছিলেন না তেমন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল হক মুন্সি বলেন, ‘রিপন শীল হত্যা মামলাটি তদন্তাধীন। মামলার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স নির্দেশনা ও সহযোগিতা প্রদান করছে।’
- বিষয় :
- বাবা
