ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষক সিন্ডিকেট লুটছে কোটি টাকা

চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষক সিন্ডিকেট লুটছে কোটি টাকা
×

কুমারখালীর জোতমোড়া গ্রামে সম্প্রতি আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত কয়েকজন কৃষিশ্রমিক সমকাল

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ০০:২১

‘আগের দিন আসছি, বলল আজকে আসবা। আজ আসলাম, এখন বলছে দুপুরে আসতে। প্রত্যেক দিন এমন ঘুরাচ্ছে। আমার জনের দাম (মজুরি) ১ হাজার টাকা পাট ধুলি হয়। কিন্তু সার না দিয়ে এ রকম ঘুরাচ্ছেন। আজ না কাল, কাল না পরশু। জন (দিনমজুরি) কামাই করে আর কয়দিন ঘুরব।’ কথাগুলো বলছিলেন কুমারখালীর বল্লভপুর গ্রামের কৃষক সাচ্চু হোসেন (৪০)।
সম্প্রতি যদুবয়রা ইউনিয়নের বিসিআইসির ডিলারের বিক্রয় কেন্দ্রে কথা হয় এ কৃষকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চার বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছি। ডিলার সার দেন ১০ সের। এত কম নিয়ে কী করব? ডিলার বলেন সাব-ডিলারের কাছে যেতে। কিন্তু তারা ১ হাজার ৩৫০ টাকা বস্তা সার বিক্রি করছেন ১ হাজার ৭০০-৮০০ টাকায়।’ সার কালোবাজারে বিক্রিরও অভিযোগ করেন তিনি।
সরেজমিন দেখা যায়, যদুবয়রা ডিলার পয়েন্টে কৃষকের ভিড়। অনেকে ব্যবস্থাপকের সঙ্গে তর্কাতর্কি করছেন। এ সময় দক্ষিণ যদুবয়রা গ্রামের কৃষক রাজীব হোসেন বলেন, ‘ডিলার বলেন সার নেই। অথচ সাব-ডিলারদের কেজিতে ৫ থেকে ৯ টাকা বেশি দিলেই বস্তা বস্তা সার দিচ্ছেন।’
ডিলার ৫ বা ১০ কেজির বেশি সার দেন না বলে অভিযোগ জোতমোড়া গ্রামের রুবেল হোসেনের। তাঁর ভাষ্য, খোলাবাজার থেকে ২৭ টাকা কেজির টিএসপি কিনেছি ৩৬ টাকায়। ২০ টাকার এমওপি বিক্রি করছে ২৮ টাকায়। কোনোদিন সরকারি দামে সার কেনা যায় না। কৃষকের এমন অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি যদুবয়রা ইউনিয়নে বিসিআইসি ডিলারের ব্যবস্থাপক মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, কালোবাজারি নয়, কৃষক অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারণে তৈরি হচ্ছে সংকট।
উপজেলার পান্টি, বাগুলাট, চাপড়াসহ অনেক এলাকায় খোঁজ নিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন ডিলাররা। এক সপ্তাহ সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, আমন ধানের চারা রোপণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। ন্যায্য মূল্যের ডিলার পয়েন্টে গিয়ে চাহিদামতো সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে সাব ডিলার ও খোলাবাজারে ছুটছেন তারা। সেখানে সরকার নির্ধারিত ২৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে শুধু ইউরিয়া। 
প্রতি কেজি টিএসপি ২৭ টাকার পরিবর্তে ৩৬ থেকে ৩৮, ডিএপি ২১ টাকার পরিবর্তে ৩০ থেকে ৩২ এবং এমওপি ২০ টাকার পরিবর্তে বিক্রি হচ্ছে ২৬ থেকে ২৭ টাকায়। পান্টির পূর্বাশা ভালুকা ক্লাব মোড়ে দুই বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছেন সাগর হোসেন। তিনি বলেন, ‘এমওপি প্রতি কেজি ২৭, ইউরিয়া ২৮, টিএসপি ৩৭ ও ডিএপি কিনেছি ২৭ টাকায়।’ স্থানীয় সাব-ডিলার রবিউলের কাছ থেকে সার কিনেছেন তিনি। অভিযোগ অস্বীকার করে রবিউল বলেন, ‘আগে বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতাম। এখন সার পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বিক্রি বন্ধ।’
কৃষকের অভিযোগ, ডিলাররা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। এ সুযোগে সাব-ডিলার ও খোলা বাজারের ব্যবসায়ীরা কেজিতে ৫ থেকে ৯ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন। অভিযোগ অস্বীকার করে পান্টি ইউনিয়ন বিসিআইসি ডিলার জাবিউল্লাহ পলাশ বলেন, কৃষকরা একবারে বেশি সার চান। বরাদ্দ আসে ধাপে ধাপে। সেজন্য কম-বেশি হচ্ছে। দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে না।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার অনুমোদিত ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ৯ হাজার ৭১০ টন। এ ছাড়া টিএসপি ২ হাজার ২৫৫, ডিএপি ৪ হাজার ৫৪০ এবং এমওপি ছিল ২ হাজার ৬৬০ টন। চলতি অর্থবছরে অনুমোদন হয়েছে ইউরিয়া ৯ হাজার ৭১০, টিএসপি ২ হাজার ৪৫৫, ডিএপি ৪ হাজার ৫৪০ এবং এমওপি ২ হাজার ৮১০ টন।
কৃষি কার্যালয়ের তথ্য এবং কৃষকের অভিযোগ অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রতি কেজি ৯ টাকা হিসেবে টিএসপি সার বাবদ ২ কোটি ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট। প্রতি কেজি ৫ টাকা হিসেবে ডিএপি ও এমওপি বাবদ চক্রটি আরও ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে। কৃষকের পকেট কাটা এমন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এক এলাকার সার অন্যত্র বিক্রি অবৈধ। তবুও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে এমন কার্যক্রমে সংকট বাড়ছে। যদুবয়রা-পান্টি সড়কে মো. খোকনের করিমনে পাওয়া যায় ৮০ বস্তা এমওপি সার। তিনি বলেন, ‘পাংশা থেকে এগুলো এনে গোদের বাজারের মেসার্স লাকী এন্টারপ্রাইজের জাকির হোসেনকে দিচ্ছি। আমরা চুনোপুঁটি, রাঘব বোয়ালদের ধরেন।’
খোকনের দাবি স্বীকার করে জাকির হোসেন বলেন, ‘সার বেচার লাইসেন্স নেই। কৃষকের চাহিদা থাকায় বাইরে থেকে কিনেছি। বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছি। বৈধ-অবৈধ জানি না।’
এরই মধ্যে সারের কৃত্রিম সংকট ও দাম বাড়ার খবর পেয়ে সোমবার যদুবয়রা, পূর্বাশা ক্লাব, গোদের বাজার ও পান্টি বাজারে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। এ সময় লাইসেন্স না থাকা, অবৈধভাবে সার মজুত ও বেশি দামে বিক্রির দায়ে লাকী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। 
আদালত পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিজয় কুমার জোয়ার্দার। এদিন যদুবয়রা বিসিআইসি ডিলার পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে সতর্ক করে প্রশাসন। অভিযানের খবর পেয়ে দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যান পূর্বাশা ক্লাবমোড় এলাকার সাব-ডিলার রবিউল ইসলাম।
কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর প্রায় ১৪ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সারের সংকট নেই, নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।’ যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া বিসিআইসি ডিলার সমিতির সভাপতি আব্দুল গাফফার। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সরকারি বরাদ্দ কম। সাব-ডিলাররা অতিরিক্ত দামে বাইরে থেকে কিনছেন। কেজিতে ৫­-৭ টাকা বেশিতে বিক্রি করছেন।
উএনও এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, ‘পেঁয়াজের মতো ধানের মৌসুমে সার কৃত্রিম সংকট ও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ শোনা গেছে। দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×