রাধাপুরের বাসিন্দা, এই ছিল ‘অপরাধ’
নিহত ছাব্বিরের দুই সন্তান মাহমুদ ও মাহদীর সঙ্গে তাঁর অসহায় বাবা আব্দুর রউফ। সন্তান হত্যার বিচার দাবি করেছেন সরকারের কাছে। ছবি: সমকাল
এম এ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৪:১৩
মাত্র ১০ টাকার অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে বিতর্কের জেরে মঙ্গলবার সকালে সংঘর্ষে জড়ান নবীগঞ্জের রাধাপুর জামারগাঁও ও কাকুড়া করিমপুরের বাসিন্দারা। সংঘর্ষের সময় নিজের জমিতে কাজ করছিলেন ছাব্বির। কুকড়া করিমপুরের কয়েকজন তাঁকে জমিতে গিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।
এ দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের কোনো কিছুতেই ছিলেন না রাধাপুর গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুর রউফের ছেলে নিহত ছাব্বির। তাঁর অপরাধ তিনি রাধাপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ৫০ জন।
‘আমার বাছা আরত ফিরে আইল না, তারে কেন মারল সেটাও জানি না, আমি ছেলের হত্যাকারীর ফাঁসি দেখতে চাই।’ নবীগঞ্জের রাধাপুর গ্রামের আব্দুর রউফের বুকফাটা কান্নায় যেন স্তব্ধ ছিল গোটা গ্রাম। আগের রাতেই যে শেষবার ছেলেকে জীবিত দেখতে পাওয়া, হয়তো কল্পনাই করেননি বৃদ্ধ বাবা।
আব্দুর রউফ বলেন, সকালে জমিতে ধানের চারা লাগাতে যায় ছাব্বির। কথা ছিলে বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে বাজারে যাবে। কিন্তু ছেলে সেদিন আর বাড়িই ফেরেনি।
বুধবার সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহত ছাব্বির মিয়ার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ তাঁর গ্রামের বাড়ি পাঠানো হয়। সেই লাশ দেখে সব হারানোর কষ্টে আর্তচিৎকার ছাড়েন বাবা আব্দুর রউফ। জানতে চান তাঁর সন্তানের অপরাধ। যার উত্তর দিতে পারেনি রাধাপুর বা কুকড়া গ্রামের কেউ।
ছাব্বির হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই পুলিশ রাধাপুর ও কাকুড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ ঘটনায় এখনও নবীগঞ্জ থানায় কোনো মামলা হয়নি।
গতকাল কাকুড়া করিমপুরের চৌরাস্তায় গিয়ে দেখা যায়, যেখানে শত শত টমটম ও সিএনজি অটোরিকশার ভিড় লেগে থাকে। সেই স্থান একেবারে ফাঁকা। এখান থেকেই দুদিন আগে সংঘাতের সূত্রপাত। সেখানে উপস্থিত কুকড়া ও রাধাপুরের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাকুড়া করিমপুর গ্রামের টমটম চালক রাশেদ, সিএনজি অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ আলী ও সিরাজুলের সঙ্গে টমটম ভাড়া নিয়ে কথাকাটাকাটি হয় রাধাপুর গ্রামের ব্যবসায়ী আফজল মিয়ার। এর জের ধরে দুই গ্রামের মানুষ সংঘর্ষে জড়ায়।
নিহত ছাব্বিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানের নাম ধরে প্রলাপ বকছেন বৃদ্ধ আব্দুর রউফ। শোকস্তব্ধ নিহত ছাব্বিরের স্ত্রী ও দুই সন্তান। একমাত্র ভাইটি প্রতিবন্ধী।
ছাব্বিরের বড় ছেলে মাহমুদ (৭) জানায়, বাবা তাকে বলেছিল, নতুন একটা শার্ট দেবে পরে স্কুলে যাওয়ার জন্য। বাবাকে তো মেরে ফেলেছে। শার্ট ছাড়া স্কুলে যাবে কিভাবে, শিশু মাহমুদের এই প্রশ্ন অপরাধী করে সবাইকে।
ছাব্বিরের স্ত্রী আকলিমা বলেন, জমি থেকে এসে গরম ভাত খাবে বলে গিয়েছিল তাঁর স্বামী। ক্ষুধা নিয়েই চলে গেল। অকারণে এভাবে মানুষ হত্যা যেন আর না হয়। আরা কোনো সন্তান যেন এতিম না হয়, এই দাবিই জানান আকলিমা। কথা বলতে বলতেই অচেতন হয়ে ঢলে পড়েন তিনি।
রাধাপুর গ্রামের বর্তমান মেম্বার তোফাজ্জুল হোসেন বলেন, মাত্র ১০ টাকার জন্য এত হানাহানি! মানুষ খুন হলো। মসজিদ কি মাইক মেরে মানুষ হত্যার জন্য? এ ধরনের কাজ যারা করেছে এবং যারা সহায়তা করেছে– প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।
রাধাপুর গ্রামের সাবেক মেম্বার ফখরুল ইসলাম বলেন, বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের সড়ক দিয়ে চলতে পারেন না। বিবিয়ানা চৌরাস্তায় গেলেই কাকুড়া করিমপুরের মানুষ রাধাপুরের বাসিন্দাদের মারধর করে। দেশের আইন-কানুন সব শেষ। মব আর এই আগ্রাসীদের দখলে সব। কেউ কোথাও নিরাপদ না।
ব্যবসায়ী আফজল মিয়ার কাছে ১০ টাকার টমটম ভাড়া ২০ টাকা চাওয়ায় তা নিয়ে তর্কবিতর্কর এক পর্যায়ে মানুষ হত্যা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবার শাস্তি চায় রাধাপুরের মানুষ। সেই সঙ্গে মসজিদের মাইক ব্যবহার করে মব আর মানুষ হত্যা বন্ধে সরকারের জরুরি পক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।
ব্যবসায়ী আফজল মিয়া বলেন, কাকুড়া করিমপুরের চৌরাস্তায় কয়েকজন টমটম ও সিএনজি অটোরিকশা চালক মারধর করে টাকাপয়সা ছিনতাই করছে। তারা গায়ের জোরে ভাড়া আদায় করে। এসব খুনি মাদকাসক্তরা ছাব্বির হত্যাকাণ্ডে জড়িত।
হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর সেক্রেটারি শাহজাহান আলী ছাব্বিরের পরিবারের সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো ধরনের অন্যায় সহ্য করা হবে না। এ সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
নবীগঞ্জ থানার ওসি শেখ মো. কামরুজ্জামান বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। এখনও কেউ মামলা করেনি। অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এলাকার পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
- বিষয় :
- নবীগঞ্জ
