বালু তোলায় উপেক্ষিত ইজারার শর্ত
বালুমহাল থেকে বাল্কহেডে করে নেওয়া হচ্ছে বালু। সিলেটের বাদাঘাট এলাকার চেঙ্গেরখাল নদী ইউসুফ আলী
মুকিত রহমানী, সিলেট ব্যুরো
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২১
মহালের নির্ধারিত এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা বা অবৈধভাবে বালু তোলা অব্যাহত আছে কিনা–এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই ছাড়াই ইজারা দেওয়া হচ্ছে বালুমহাল। কোনো মহালের বিরুদ্ধে আবেদন করা হলে মূল্যায়ন করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বালুমহাল ইজারার ১০ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, পরিবেশ, রাস্তাঘাট-হাটবাজার, চা বাগান ও সড়কের ক্ষতি হয় এমন স্থানে বালু উত্তোলন করা যাবে না। পরিবেশ
বিধ্বংসী পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করা যাবে না বা পরিবেশের ক্ষতি হলে ইজারা তাৎক্ষণিক বাতিল করা হবে। ৯ নম্বর শর্তে আছে–পাম্প, ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা যাবে না।
নদীর তীরে রাখা যাবে না বালু। মহালের আয়তন বাড়ানো-কমানো বা ক্ষতিসাধন বা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা যাবে না। ১২ নম্বর শর্তে বলা হয় বালু ছাড়া অন্যকিছু উত্তোলন করা যাবে না। তবে বরাবরই এসব শর্ত লঙ্ঘন করে প্রতি বছর যন্ত্রের সাহায্যে এবং ইজারা বিধিবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, এসব বালুমহাল ইজারার আগে করা হয় না অ্যাসেসমেন্ট বা মূল্যায়ন। আদৌ সেখানে বালু আছে কিনা, থাকলেও পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে কিনা বা ইজারার পর ক্ষতি হয়েছে কিনা সে বিষয়ে কোনো নজরদারি বা মূল্যায়ন না করেই বছরের পর বছর দেওয়া হচ্ছে বালুমহাল ইজারা। ইজারাদাররা অনেক মহালে বালু সংকট রয়েছে জেনেও বহির্ভূত এলাকার আশায় সরকারি অঙ্কের দ্বিগুণ টাকা দিয়ে ইজারা নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, বালু ও পাথরের রাজ্য সিলেট জেলায় ৪০টি বালুমহাল রয়েছে। বালুমহাল প্রতি বছরই ইজারা দেওয়া হচ্ছে। এবারও ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য বালুমহাল ইজারা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এসব বালুমহাল বছরের পর বছর ইজারা দিয়ে এলেও কোনো মূল্যায়ন হয় না। মানা হয় না ইজারার শর্তাবলি। ইজারাবহির্ভূত জায়গা থেকে বালু উত্তোলনের আশায় বড় অঙ্কের রাজস্ব দিয়ে ইজারা নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
চলতি বছরের ২৭ আগস্ট জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ইজারার বাইরে কোনো স্থান থেকে বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অভিযান ও জরিমানাও করা হচ্ছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শাখার তথ্য মতে, সিলেট জেলায় ৪০টি বালুমহালের মধ্যে ১৫টি ইজারা দেওয়া হয়েছে। ৫টি রয়েছে প্রক্রিয়াধীন। প্রক্রিয়াধীন আছে সদরের বড়চর আঙ্গারুয়া, জকিগঞ্জের বারহাল ইউনিয়নের নয়া দুবাগ, গোয়াইনঘাটের ১১৭ গোয়াইন নদী, হাজিপুর আহারকান্দি ও ফতেহপুর।
দেখা গেছে মহানগর এলাকার মালনীছড়া ও বড় ছড়ার সীমানার বাইরে থেকে বালু উত্তোলন হচ্ছে। ধলাই নদী ও পিয়াইন নদী, হাদারপাড় মহালে রয়েছে বালু সংকট। পিয়াইন নদীর ইজারার বাইরে উত্তোলন হচ্ছে। গোয়াইনঘাটের লেঙ্গুরা বালুমহাল ইজারা থাকলেও জাফলং, বাংলাবাজার, হাজীপুরসহ কয়েকটি স্থান থেকে বালু উত্তোল হচ্ছে। জৈন্তাপুরের বড়গাঁও ও সারি নদী-১ ও ২ ইজারা থাকলেও বালু উত্তোলন হচ্ছে শ্রীপুর রাংপানি নদী ও গোয়াইনঘাটের নলজুরী পাশে অবস্থিত খাঁসি নদী, বাওন হাওর ও শেওলার টুক নামক স্থান থেকে। সেখানে আবার ড্রেজার মেশিন ব্যবহার হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সুরমা নদী নওয়াগাঁও বালুমহালের কারণে নদী-তীরবর্তী কানাইঘাট এলাকার বড়দেশ উত্তর, কায়স্থগ্রাম, ব্রাহ্মণ গ্রামের লোকজন নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। গোয়াইনঘাটের হাদারপাড় বালুমহালের কারণে দয়ারবাজার থেকে বিছনাকান্দি পর্যন্ত বালু উত্তোলনের ফলে বেশ কিছু এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।
ইজারা এলাকায় বালু সংকটের কথা স্বীকার করে ইজারাদার ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ধলাই সেতুর অজুহাতে নানাভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন তিনি। তাঁর ইজারাকৃত জায়গার মধ্যে ৮৮ একর জায়গাই সেতুর কারণে বাদ দেওয়ায় তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে ইজারামূল্য ফেরতের আবেদন করেছেন। যন্ত্রের ব্যবহার সবসময় চলে আসছে বলে জানান তিনি।
সুনাই নদীর বালু মহাল ইজারা না থাকলেও জালিয়ারপাড়, ছনবাড়ি, বাহাদুরপুর, বৈশাকান্দি, নোয়াকোটসহ কয়েকটি এলাকায় বালু উত্তোলন রাতে ও ভোরবেলায় উত্তোলন চলছে। সারি-১ মহালের অংশীদার মোমিনুল হক জানান, ছোট মেশিনের পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতিতে তাদের মহাল থেকে বালু উত্তোলন হয়। মহালের কারণে ক্ষতি হচ্ছে না এবং ইজারার বাইরে কেউ বালু উত্তোলন করছে না উল্লেখ করে তিনি জানান, ইজারায় সরকারি দাম চাওয়া হয়। মহালের অবস্থা কী সেটি দেখা হয় না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন থেকে মতামত চাওয়া হয় নদীর গভীরতা ও ক্ষতির বিষয়ে। বালু আছে কিনা সেটি তারা দেখেন। জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, পাথরের পর বালুও নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। আগামীতে মূল্যায়নের বিষয়টি মাথায় রেখে ইজারা দেওয়া হবে।
- বিষয় :
- বালুখেকো
