অসহায়ত্ব, অপরাধ এবং একজন মা
খুলনা নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাচ দেওয়া ঘরটি এখন অস্থায়ী কেবিন। পাঁচ দিন ধরে এখানে বন্দি শাহজাদী। তাঁর সঙ্গে ১০ দিন বয়সী শিশু, যে এখনও বাইরের আলো-বাতাসের ছোঁয়া পায়নি। শনিবার দুপুরে তোলা -সমকাল
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৪ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১২:২৬
কাচে ঘেরা অস্থায়ী কক্ষে দিনেও অন্ধকার। সেখানে ঘুমিয়ে ফুটফুটে এক শিশু। পাশে মা শাহজাদী। হাসি নেই তাঁর মুখে। স্বজনরা কেউ পারছেন না ১০ দিন বয়সী শিশুটিকে একবার কোলে নিতে। কারণ মায়ের সঙ্গে হাসপাতালের কক্ষে বন্দি সে। বাইরে পুলিশের সতর্ক পাহারা।
খুলনা নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে দোতলার দৃশ্য এটি। মা ও নবজাতকের এমন দশার পেছনের কারণ আরও বেদনার। রয়েছে চার মেয়ের পর পঞ্চমটিও কন্যাশিশু হওয়ার সামাজিক ও পারিবারিক কটাক্ষ।
১১ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে পঞ্চম কন্যার জন্ম দেন শাহজাদী। এর পরপরই তাঁকে হাসপাতালে রেখে সটকে পড়েন স্বামী সিরাজুল ইসলাম। আর যোগাযোগ করেননি। এমন পরিস্থিতির মাঝেই শাহজাদী করে বসেন এক অপরাধ। ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে একই হাসপাতালে জন্ম নেওয়া আরেকজনের ছেলেশিশু চুরি করে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
পরে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ ও পুলিশের তৎপরতায় ওই দিন সন্ধ্যায় নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় শাহজাদীর মা নার্গিস বেগমকে। চুরি যাওয়া শিশুর বাবা মির্জা সুমনের মামলায় নার্গিস বেগমকে কারাগারে পাঠানো হয়। আর অসুস্থ থাকায় শাহজাদীকে হাসপাতালে একটি কক্ষে বন্দি রাখা হয়।
গতকাল শনিবার চার পুলিশ সদস্যকে দুই শিফটে হাসপাতালের কক্ষটির সামনে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। নবজাতক মায়ের সঙ্গে থাকলেও শাহজাদীর অন্য চার মেয়ে রয়েছে আত্মীয়ের বাসায়। সুস্থ হলেই শাহজাদীকে কারাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে পুলিশ।
হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক এনামুল হক জানান, ১০ সেপ্টেম্বর স্ত্রীকে হাসপাতালে আনেন সিরাজুল ইসলামসহ দুজন। তারা আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে ছেলেসন্তান হবে জানতে পেরেছেন। কিন্তু পরদিন শাহজাদী কন্যাসন্তান জন্ম দেন। এরপর থেকে বাবা সিরাজুলকে পাওয়া যায়নি। দুদিন ধরে অন্য ব্যক্তিও হাওয়া।
শাহজাদীর গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শুভদিয়া ইউনিয়নের দিয়াপাড়া গ্রামে, বাবার নাম লিয়াকত আলী মোল্লা। গতকাল তাঁর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘরে তালা দেওয়া। গ্রামের অন্য প্রান্তে থাকা শাহজাদীর ফুফু জানান, হাসপাতালের সমস্যা নিয়ে সবাই উকিলের সঙ্গে কথা বলতে খুলনা গেছে।
শাহজাদীর ভাই শাহজাদা জানান, তাঁর বোনের শ্বশুরবাড়ি রামপালের আদাঘাটে। কিন্তু বিস্তারিত ঠিকানা তিনি দেননি। গত বুধবার থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রতিদিন হাসপাতালে এ প্রতিবেদক গেলেও শাহজাদীর শ্বশুরবাড়ির কোনো আত্মীয়কে পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার এসআই শাহীন জানান, ভুক্তভোগী মানব পাচার আইনে মামলা করেছেন। এখানে পুলিশের কিছু করার নেই।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী মোমিনুল ইসলাম বলেন, পুরো বিষয়টি অমানবিক। এই যুগেও কন্যাশিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ সবার জন্য লজ্জার।
মোমিনুল ইসলাম জানান, মানব পাচার আইনের ন্যূনতম শাস্তি তিন বছরের জেল। পরিবেশ ও মানবতা বিবেচনায় না নিলে মায়ের সঙ্গে শিশুটির বন্দিজীবন দীর্ঘ হবে।
পুরো বিষয় জানালে মামলার বাদী মির্জা সুমন সমকালকে বলেন, চার দিনের মাথায় ছেলে চুরি হওয়ায় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি। তখন মামলা করেছি। এখন বুঝতে পারছি, ওই মা কত কষ্টে আছেন। আমরা ছেলে ফিরে পেয়েছি, এখন অন্য কোনো দাবি নেই।
শাহজাদীর ভাই শাহজাদা জানান, বাদীর সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তিনি মামলা তুলে নিতে সম্মত হয়েছেন। উকিল কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- অসহায় পরিবার
