শুনানি ছাড়াই দর নির্ধারণে ক্ষোভ জমিহারা মানুষের
ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের রঘুনাথপুর এলাকায় নির্মাণাধীন একটি কালভার্ট -সমকাল
শাহারিয়ার রহমান রকি, ঝিনাইদহ
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৯
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বুজরুকমুন্দিয়া মৌজার ৩৯৭ দাগের ০.১২ একর জমি বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করেন মশিউর রহমান। সেভাবেই ২০১২ সাল থেকে সরকারকে খাজনা দিয়ে আসছেন তিনি। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করতে তাঁর জমি অধিগ্রহণের নোটিশ দেয় সরকার। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেলা প্রশাসকের নোটিশে জমিটি দেখানো হয় ডাঙা হিসেবে। একই জমির অর্ধেকের বেশি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ডোবা দেখিয়ে অধিগ্রহণের নোটিশ দেওয়া হয়।
কোনো প্রকার শুনানি না করেই জমিটি অধিগ্রহণের নোটিশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন মশিউর রহমান। চলতি বছরের ৩ আগস্ট তাঁকে দেওয়া নোটিশে প্রতি শতকের দাম ধরা হয়েছে এক হাজার ৮৪৭ টাকা। অথচ ওই জমির বাজারদর প্রায় চার লাখ টাকা। এই মহাসড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণকালে ঝিনাইদহ সদর ও কালীগঞ্জের কয়েকশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিকরা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তারা বহু বছর আগের মৌজা রেটের পরিবর্তে সরেজমিন তদন্ত, বাজারদর অনুসারে দাম নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। দফায় দফায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ করলেও কোনো সুরাহা পাননি তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে বনপাড়া, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, নাভারন, সাতক্ষীরা হয়ে ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত ২৬০ কিলোমিটার মহাসড়কটি ছয় লেনে সম্প্রসারণের কথা। হাটিকুমরুল থেকে ঝিনাইদহ বাস টার্মিনাল ও যশোরের চাচড়া থেকে ভোমরা পর্যন্ত ২১২ দশমিক ৫২ কিলোমিটার অংশের কাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের সমীক্ষা প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ। প্রাথমিক কাজ শেষে ঝিনাইদহ বাস টার্মিনাল থেকে যশোরের চাচড়া পর্যন্ত ৪৭.৪৮ কিলোমিটার অংশ নির্মাণের জন্য একনেকে অনুমোদন পায়। তিনটি লটে বিভক্ত এই অংশের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি। কিন্তু অধিগ্রহণ করা কোনো জমিই জেলা প্রশাসন থেকে বুঝে পায়নি উইকেয়ার প্রকল্প।
উইকেয়ার প্রকল্প সূত্র জানায়, লট-১ এর আওতায় ঝিনাইদহ বাস টার্মিনাল থেকে কালীগঞ্জের সরকারি মাহতাব উদ্দিন কলেজ পর্যন্ত অংশ রয়েছে। এটি সড়ক বিভাগ থেকে উইকেয়ারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ। লট-২ এর আওতায় সরকারি মাহতাব উদ্দিন কলেজ থেকে যশোরের মান্দারতলা পর্যন্ত অংশ সড়ক বিভাগ হস্তান্তর করে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল।
তিনটি লটে মোট জমি প্রয়োজন ৩৭৩ দশমিক ১৩ একর। লট-১ এর আওতায় জমি প্রয়োজন ৯৩ দশমিক ৫০ একর, এই অংশে বরাদ্দ রয়েছে ৮৫৪ কোটি টাকা। লট-২ এর আওতায় জমি প্রয়োজন ১৩২ একর, এই অংশে বরাদ্দ ৭৩৭ কোটি টাকা।
লট-১ ও লট-২ এর জন্য অধিগ্রহণের আওতায় পড়েছে ঝিনাইদহ সদর ও কালীগঞ্জ উপজেলায় ৩২টি মৌজা। এর মধ্যে লট-১ এর অধীনে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং লট-২ এর অধীনে মাত্র ১ দশমিক ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, লট-১ এর ২২টি কালভার্টের মধ্যে ১০টির কাজ ৬০-৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। চুটলিয়া মোড়, বাইপাস সড়ক ও ভুটিয়ারগাতী এলাকায় ফ্লাইওভারের কিছু গার্ডার ও পিলারের কিছু কাজ হয়েছে। অন্যদিকে লট-২ এর অধীনে কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা এলাকায় চিত্রা নদীতে সেতুর কিছু পিলারের কাজ চলছে। রঘুনাথপুরে একটি কালভার্টের জন্য একপাশে রড বেঁধে মাটির অংশে ঢালাই দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।
কালীগঞ্জের মশিউর রহমানের জমির যে অংশ ডোবা দেখিয়ে অধিগ্রহণের চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেটি ১৬৫ নম্বর আরএস খতিয়ানেও ডাঙা হিসেবে নথিভুক্ত। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ভূমি উন্নয়ন কর রসিদে বাণিজ্যিক হিসেবেই ওই জমির সরকারি খাজনা পরিশোধ করেছেন তিনি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে মশিউর রহমান বলেন, ‘বাণিজ্যিক খাজনা দেই, সেই জমি কেন শুনানি ছাড়া শ্রেণি পরিবর্তন হলো? আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার জমি অধিগ্রহণের কথা জানিয়ে তাঁর কাছে যেতে বলেছিলেন। তাঁর ডাকে সাড়া না দেওয়া ও বিরোধী রাজনীতির কারণে আমিসহ অনেকেরই এমন ক্ষতি করেছে।’ এ জন্য জেলা প্রশাসনের কিছু সার্ভেয়ারকে দায়ী করেন।
একই রকম অভিযোগ তোলেন ক্ষতিগ্রস্ত অন্য জমি মালিকরা। তাদের দেওয়া তথ্যমতে এমন মানুষের সংখ্য কয়েকশ। কালীগঞ্জের কলাহাট এলাকার ব্যবসায়ী হারেজ আলীও এভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, বাকুলিয়া মৌজায় রাস্তার পাশে তাঁর ৫০ শতক জমি আছে। এর মধ্যে ২২ শতক অধিগ্রহণের তালিকায় গেছে। তাঁর জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রতি শতাংশে ২০-২৫ লাখ টাকা। অথচ প্রশাসন তাঁকে শতকপ্রতি দাম দিয়েছে মাত্র এক লাখ ১১ হাজার টাকা। হারেজ আলীর ভাষ্য, ‘পাশের খয়েরতলা এলাকার অন্য মালিককে শতকপ্রতি দাম দেওয়া হয়েছে কোটি টাকার বেশি। এই বৈষম্য আমাদের পথে বসিয়ে দেবে।’
কালীগঞ্জ শহরের প্রধান বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ১০ দশমিক ২০ শতক বাণিজ্যিক জমি আছে শহিদুল ইসলামের। প্রতি শতক জমির বর্তমান বাজারদর দুই কোটি টাকা। অথচ শহিদুলের জমি অধিগ্রহণের জন্য দর ধরা হয়েছে ছয় লাখ টাকা। এই প্রক্রিয়ায় জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর শাস্তির দাবি করেন তিনি।
উইকেয়ার প্রকল্পের ফেজ-১ এর দায়িত্বরত উপপ্রকল্প ব্যবস্থাপক-১ নিলন আলী বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। অধিগ্রহণের একটু জমিও আমরা বুঝে পাইনি। যে কারণে
আমরা দ্রুতগতিতে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে নিতে পারছি না। জমি বুঝে পেলে পূর্ণগতিতেই কাজ চলবে।’
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল বলেন, অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে চলেছে। এ নিয়ে মানুষের অভিযোগ থাকতে পারে। জমি মালিকরা অভিযোগ দিলে শুনবেন। তবে আইনগতভাবেই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।
- বিষয় :
- জমি উদ্ধার
