পলিথিন-ওয়ানটাইম প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ফার্নিচারসহ দামি পণ্য
জাহিদুর রহমান, কক্সবাজার থেকে ফিরে
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৯:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোরের আলো ফোটার আগেই কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীতীরে শুরু হয় অন্য রকম এক কর্মযজ্ঞ। জোয়ারের পর ভাটার টানে নদীর বুক ফুঁড়ে ভেসে আসে নানা রঙের মোড়ক, পলিথিন ও প্লাস্টিক। আগে এগুলোর শেষ গন্তব্য ছিল সমুদ্র। এখন সেই বর্জ্য নদীতেই থেমে যাচ্ছে, রূপ নিচ্ছে নতুন কাঁচামালে।
বাঁকখালী নদীর রুমালিয়ারছড়ায় বসানো হয়েছে এক বিশেষ বাঁধ। নদীর বুকজুড়ে ভাসমান কাঠামো। ভেসে আসা প্লাস্টিক এতে আটকে যায়। স্থানীয়রা একে বলেন, ‘ভাসমান বাঁধ।’ প্রতিদিন প্রায় ৪০ কেজি প্লাস্টিকসহ ১৭০ কেজি বর্জ্য এতে আটকা পড়ে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা এই বর্জ্যই এখন হয়ে উঠছে পরিবেশ রক্ষার নতুন কৌশল ও কাঁচামালের উৎস।
ব্র্যাকের প্লাস্টিক ফ্রি রিভার অ্যান্ড সি ফর সাউথ এশিয়া (পিএলইএএসই) প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্র ও তীরবর্তী অঞ্চল থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন। এরপর সেগুলোকে কারখানায় রিসাইক্লিং করে তৈরি করা হচ্ছে টেকসই ও ব্যবহার উপযোগী আসবাব। এ উদ্যোগের ফলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন বাজার। ফেলে দেওয়া পলিথিনই হয়ে উঠছে মূল্যবান কাঁচামাল। কক্সবাজারের প্রকল্প কারখানায় এমন চিত্র দেখা গেছে।
পিএলইএএসই প্রকল্পের সমন্বয়ক হাসান রেজাউল করিম বলেন, খাল-নদী হয়ে প্লাস্টিক কীভাবে সাগরে যায়, তা আমরা এই ফ্লোটিং ব্যারিয়ারের (বাঁধ) মাধ্যমে নিজের চোখে দেখি। এখানে দুই ধরনের বর্জ্য পাওয়া যায়– অর্গানিক (জৈব) আর প্লাস্টিক। অর্গানিক অংশটা মাছের খাবার হিসেবে পানিতেই ফেলে দেওয়া হয়। প্লাস্টিকগুলো সংগ্রহ করে পাঠানো হয় রিসাইক্লিং প্লান্টে।
কক্সবাজার দেশের সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী এলাকাগুলোর একটি। প্রতিদিন শহরজুড়ে তৈরি হয় ৩৪ দশমিক ৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য। ব্র্যাকের ২০২৪ সালের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, এর বড় অংশই একবার ব্যবহারযোগ্য– পাতলা পলিথিন, মোড়কজাত প্যাকেট, বোতল ও পলিপ্রোপিলিন। এর মধ্যে অন্তত ৫০০ কেজি বর্জ্য প্রতিদিন খোলা জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়। খোলা জায়গা থেকে নালা হয়ে খালে, খাল থেকে নদীতে এবং নদী থেকে সোজা সমুদ্রে পৌঁছে যায় এই বর্জ্য। এতে বাধাগ্রস্ত হয় পানি প্রবাহ, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ধ্বংস হয় পরিবেশ। শহরের কিছু এলাকায় নালা ভর্তি থাকে প্লাস্টিকের মোড়কে। প্লাস্টিক বর্জ্য এখন শুধু শহরের সমস্যা নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছে উপকূল, খাল, নদী ও সাগরের প্রাণিকুল পর্যন্ত। পলিথিন ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে হুমকির মুখে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, এমনকি ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রও।
এই ভয়ংকর চক্রে ব্র্যাকের উদ্যোগ যেন আশার আলো। শহরের বাইরে রামুর বনতলা দক্ষিণ মিঠাছড়িতে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম আধুনিক প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কারখানা। এখানে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য নতুন আকারে ফিরে আসে।
কারখানায় ঢোকার মুখেই দেখা মেলে রংবেরঙের প্লাস্টিকের স্তূপ। প্রথম ধাপে মেশিনে বর্জ্য আলাদা করা হয়। কাগজ, মাটি ও ধাতু ফেলে রেখে শুধু প্লাস্টিক বাছাই করা হয়। এরপর শুরু হয় ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াকরণ। প্রথমে বড় প্লাস্টিকগুলো কেটে ছোট টুকরো করা হয়। তারপর ওয়াশ ইউনিটে পাঠিয়ে গরম পানিতে ধোয়া হয়, যাতে ময়লা ও তেলজাতীয় পদার্থ সরে যায়। ধোয়ার পর এগুলো শুকানো হয়। এরপর গলিয়ে তৈরি করা হয় ল্যাম্বার ও সিট, কাঠের বিকল্প উপাদান। সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে ঘরের খাট, চেয়ার, টেবিল, সোফা, বালতিসহ প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী।
কারখানার কর্মী রফিকুল ইসলাম জানালেন, পলিথিন থেকে কাঠের মতো শক্ত বস্তু তৈরি হচ্ছে এখানে। এই আসবাবে ঘুণে ধরে না। ২০২৪ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। কারখানার বর্তমান সক্ষমতা ৫০০ কেজি, যা শিগগিরই এক হাজার কেজিতে উন্নীত করা হবে।
ব্র্যাকের পিএলইএএসই প্রকল্পের ম্যানেজার (পার্টনারশিপ অ্যান্ড কোলাবরেশন) মোস্তাক আহাম্মদ বললেন, সব প্লাস্টিকেরই বাজার আছে, কিন্তু একবার ব্যবহার করা পলিথিন বা মোড়কের কোনো মূল্য নেই। কেউ এগুলো কুড়ায় না, বিক্রিও করতে পারে না। তাই রাস্তায় পড়ে থাকে, শেষমেশ নদী ও সমুদ্রে যায়। আমরা সেই পলিথিনকেই সম্পদে রূপ দিচ্ছি।
শুরুর দিকে স্থানীয়দের উৎসাহিত করতে ব্র্যাক নিয়েছিল অভিনব উদ্যোগ। অনেকেই বাড়ি থেকে পলিথিন জমিয়ে আনত। এতে শুধু পলিথিন সংগ্রহই হয়নি, বেড়েছে সচেতনতা। পরে এই উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বাজার। স্থানীয় ভাঙাড়ি দোকানগুলো এই পলিথিন কিনছে, নারীদের দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ।
কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, একদিকে বর্জ্য আলাদা করা হচ্ছে, অন্যদিকে মেশিনে গলছে প্লাস্টিক। বাতাসে গরম গলিত প্লাস্টিকের গন্ধ। মেশিনের কনভেয়ার বেল্ট দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে ছোট ছোট টুকরো, ঢুকছে গলনচুল্লিতে। প্রতিটি ধাপে কাজ করছেন স্থানীয় নারী-পুরুষ, যারা আগে বর্জ্য সংগ্রহ বা অনানুষ্ঠানিক কাজে জড়িত ছিলেন। এখন তারা নিয়মিত চাকরি করছেন, বেতন পাচ্ছেন, নিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করছেন। কারখানায় স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক শ্রেডার, হট-ওয়াশ ইউনিট, পেলেটাইজার, শিট প্রেস– যন্ত্রগুলো প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য দানায় রূপ দেয়। এই দানাগুলো আবার ব্যবহার হয় নতুন পণ্য তৈরিতে। ব্র্যাকের এই কারখানা পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ডে ‘ইয়েলো ক্যাটেগরি ফ্যাক্টরি’ স্বীকৃতি পেয়েছে।
- বিষয় :
- প্লাস্টিক
