এক-তৃতীয়াংশ ঘরে তালা সন্ধ্যায় মাদকের আসর
মাসুদ নাসির, রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার জন্য আশ্রয়ণের প্রকল্প নিয়েছিল বিগত সরকার। বিনামূল্যে এসব ঘর উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ১৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় এমন ঘর বিতরণ হয় ৩৭৮টি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব ঘরের মধ্যে ১১৮টিতেই ঝুলছে তালা। যেসব ব্যক্তির নামে বরাদ্দ হয়েছে ঘরগুলো, তাদের বেশির ভাগই থাকেন না এসব ঘরে। কেউ স্ট্যাম্পে সই নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন, কেউ ভাড়া দিয়েছেন। অনেকে আবার নিজের নিম্ন আয়ের আত্মীয়দের থাকতে দিয়েছেন।
উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদনগরে নির্মিত হয়েছে আশ্রয়ণের ৮টি ঘর। এর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। ফাঁকা ঘরগুলো দখল নিয়েছে স্থানীয় মাদকসেবীরা। রাত নামলেই এসব ঘর বসে জুয়া। কোনোটিতে বসে মাদক সেবনের আসর।
অন্য দুটি ঘরের একটিতে থাকে কক্সবাজারের চকরিয়ার মো. শাহ আলমের পরিবার। পঙ্গু শাহ আলম পেশায় ভিক্ষুক। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে। স্ত্রী শাহেদা আক্তার অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। শাহ আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় থাকেন তিনি। এক বছর আগে এলাকাবাসীর সহায়তায় আশ্রয়ণের ঘরে উঠেছেন।
আবদুস শুক্কুরের ঘরে থাকেন গৃহকর্মী ফাহেতা আক্তার। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীতে। স্বামী মোহাম্মদ মনির বেকার। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তারা থাকেন চার বছর ধরে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবব্রত দাশের দেওয়া তথ্যমতে, রাঙ্গুনিয়ার শিলক ইউনিয়নে আশ্রয়ণের ৬টি ঘর। এর মধ্যে তালাবদ্ধ তিনটি। কোদালায় ২২টি ঘরের মধ্যে তালা ঝুলছে ৯টিতে। সরফভাটায় ৫৮টি ঘর। তালা ৫০টিতে। রাজানগরে ৩৬টি ঘর, তালাবদ্ধ ৭টি। দক্ষিণ রাজানগরে ঘর পাঁচটি, তালা দুটিতে। ইসলামপুরে ঘর তিনটি, তালা একটিতে। লালানগরে ৮টি ঘর, ৬টিতে তালা ঝুলছে। হোসনাবাদে ১৩টি ঘর, তালা তিনটিতে। পদুয়ায় ৮৬টি ঘর, তালাবদ্ধ ৮টি। বেতাগীতে ঘর ৭৯টি, তালা আছে ১১টিতে। পোমরা ইউনিয়নে ২৯টি ঘরের মধ্যে তালা ৯টিতে। পারুয়ায় ঘর দুটি, তালা দুটিতে। চন্দ্রঘোনা-কদমতলীর ৬টি ঘরের দুটি তালাবদ্ধ। স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়ায় ঘর ২১টি, তালা তিনটিতে। এ ছাড়া রাঙ্গুনিয়া পৌরসভায় ঘর চারটি, তালাবদ্ধ দুটি। উপজেলায় সব মিলিয়ে বরাদ্দ হয়েছে ৩৭৮টি ঘর। এর ১১৮টিই এখন তালাবদ্ধ।
গতকাল বৃহস্পতিবার কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, তালাবদ্ধ ঘরগুলো মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। রাতে সন্ত্রাসী, মাদকসেবী, জুয়াড়িরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। প্রতিদিন বসে কোটি টাকার জুয়ার আসর। নানা লোকের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা এখানে বসে অপকর্মের ছক সাজান।
পৌরসভার জাকিরাবাদ আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারটি ঘরের মধ্যে দুটিই তালাবদ্ধ। একটি ঘরের মালিক রোজি আক্তার। তাঁর বাড়ি সদরের ইচ্ছাখালী। তাঁর স্বামী পল্লীবিদ্যুতে কর্মরত হলেও ঘর বরাদ্দ পান। ওই ঘরটি রোজি ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন আমেনা বেগমের (৩২) কাছে। গৃহকর্মী ও হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজও করেন। তাঁর স্বামী আরমান আলী (৪৮) ট্রলিচালক। তাদের চার ছেলে, দুই মেয়ের বয়স ১৮ থেকে ৬ বছরের মধ্যে।
শিলক আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে বছরখানেক ধরে আছেন ট্রলিচালক আহম্মদ হোসেন (৩৫)। তিনি বলেন, ঘরটি খালি পড়ে আছে দীর্ঘদিন। এলাকাবাসীর সহায়তায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। প্রকৃত ঘরের মালিক মাঝে মধ্যে এসে দেখে যান। এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে অধিকাংশ ঘরেই প্রকৃত মালিকেরা থাকেন না।
সরফভাটা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫৮টি ঘরের মধ্যে তালা ঝুলছে ৫০টিতে। দুই বছর আগে একটি ঘরে চুক্তিতে উঠেছেন নাছিমা আক্তার (১৮)। তিনি জানান, দলিল ঘরের প্রকৃত মালিকের কাছে। এখানে অনেকে ঘরে থাকেন না। দিনে তালা থাকে।
আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের পাশাপাশি এলাকার লোকজনও অপরাধীদের আনাগোনায় বিরক্ত। তাদের কারণে এলাকায় ছিনতাই বাড়ছে। তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আসা-যাওয়া থাকায় প্রতিবাদের সাহসও পান না।
লালানগরের আশ্রয়ণের একটি ঘরে থাকেন মনোয়ারা বেগম (৩৫)। তিনি দীর্ঘদিন আশ্রয়ণের ঘরে ছিলেন না বলে জানান এলাকাবাসী। বিষয়টি স্বীকার করে মনোয়ারা বলেন, তাঁর বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে। আশ্রয়ণের ঘর পাহাড়ি এলাকায় পড়েছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান। মেয়ের বিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে দেখেন, তালা দেওয়া। তালা ভেঙে ঘরে ঢোকেন।
এ বিষয়ে রাণীরহাট ভূমি অফিসের তহশিলদার মোজাহেদুল ইসলাম বলেন, লালানগরের ঘরের মালিকদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন। একটি পরিবার বৈধভাবে আছে। অন্যদের সম্ভবত বৈধ কাগজ নেই।
আশ্রয়ণের ঘর যেসব এলাকায় অবস্থিত, এসব এলাকার লোকজন বলেন, প্রকৃত উপকারভোগীরা ঘরে থাকেন না। খালি ঘরগুলো প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা উচিত। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের ও জনপ্রতিনিধিদের পছন্দের লোকজনই ঘর পেয়েছিলেন।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম আজাদের ভাষ্য, ঘর দেওয়ার সময় যাচাই-বাছাই করা হয়নি। প্রকৃত ভূমিহীনদের না দিয়ে প্রভাবশালীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আবার দলীয় নেতাকর্মীদের কাছের লোক বা আত্মীয়স্বজনও পেয়েছেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘিরে কোনো অপকর্ম করতে না দেওয়ার ঘোষণা দেন রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি এটিএম শিফাতুল মাজদা ও দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি সাব্বির মো. সেলিম। তারা শিগগিরই এসব এলাকায় অভিযানের আশ্বাস দেন।
রাঙ্গুনিয়ার এসিল্যান্ড দেবব্রত দাশ জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনেকেই থাকেন না। আবার অনেক ঘরে তালা ঝোলানো। সরেজমিনে যেসব ঘরে তালা ঝুলতে দেখবেন বা ঘরে থাকেন না– এমন লোকের বরাদ্দ বাতিল করবেন।
ইউএনও মো. কামরুল হাসান বলেন, সরকারি ঘর বরাদ্দের জন্য অনেক প্রক্রিয়ায় আছে। আবার বরাদ্দ বাতিলের প্রক্রিয়াও দীর্ঘ।
- বিষয় :
- মাদকের অভিযোগ
