ভিড়ে ওত পেতেছে চোর চক্র
ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিকিট কাউন্টারের সামনে রোগীর ভিড়। ছবিটি গত বুধবারের -সমকাল
ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:০০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারগিস বেগমের ছেলে অসুস্থ। ডাক্তার দেখাতে গত বুধবার তিনি এসেছিলেন শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। টিকিট কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় তাঁর ব্যাগ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোনটি খোয়া যায়। গত বুধবার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন চুরির ঘটনা ঘটেছে দুটি। বেশ কিছুদিন ধরে একটি চোর চক্র রোগী ও স্বজনের টাকা, মোবাইল ফোন ও সোনাদানা চুরি করছে। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে শুরু করে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত এমন ২৯টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
উপজেলার দক্ষিণ তারাবুনিয়া থেকে আসা নারগিস বলেন, ‘ছেলের জন্য ডাক্তার দেখাতে (বুধবার) টিকিট নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার ব্যাগের চেইন কাটা। পরে দেখি আমার সঙ্গে থাকা ১২ হাজার টাকা, ব্যাংকের চেক বই ও মোবাইল ফোন চুরি হয়ে গেছে।’ বিষয়টি তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা জবাব দেয়, সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট। গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গায় যদি মানুষের নিরাপত্তা না থাকে, তবে মানুষ কোথায় যাবে– এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেন এই গৃহবধূ।
একই দিন ব্যাগ থেকে ১০ হাজার টাকা ও কানের দুল চুরি যায় মাহমুদা খানমের। তিনি এসেছিলেন সখীপুরের গাজীকান্দি এলাকা থেকে। তিনি বলেন, ‘আমার দুই বছরের শিশুকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখানে থাকা অবস্থাতেই ব্যাগ থেকে ১০ হাজার টাকা ও কানের দুল চুরি হয়। চিকিৎসা নিতে এসে এভাবে যদি টাকা চুরি হয়ে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’ টাকা চুরি যাওয়ায় এই নারীর কাছে বাড়ি ফেরার রিকশা ভাড়াও ছিল না।
সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৬ অক্টোবর এই হাসপাতালে চুরি হয় দুটি। এ ছাড়া এ মাসের ১, ২, ৪, ১১, ১২, ১৭, ১৮, ২৫ ও ২৮ তারিখে একটি করে; ৭, ১৬, ২১, ২৪, ২৭ ও ২৯ তারিখে দুটি করে এবং ৫ ও ১০ তারিখে তিনটি করে চুরির ঘটনা ঘটে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, রোগী ও স্বজনের দেওয়া তথ্যমতে, তিন লক্ষাধিক জনসংখ্যার উপজেলা ভেদরগঞ্জ। বিপুল মানুষ চিকিৎসার জন্য একমাত্র সরকারি হাসপাতাল ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিদিন বহির্বিভাগে নানা বয়সী প্রায় ৭০০-৮০০ রোগী সেবা নিতে আসেন। এ ছাড়া জরুরি বিভাগে ২০০-৩০০ রোগী আসেন। চিকিৎসকদের কক্ষে প্রতিদিন ভিড় থাকে। দীর্ঘ লাইন পড়ে চিকিৎসকদের কক্ষ ও টিকিট কাউন্টারের সামনে। এই সুযোগে একটি চক্র নারীদের ব্যাগ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন, দামি গহনাসহ মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নিচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনও। এ নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন তারা। কিন্তু হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট হওয়ায় কথা জানিয়ে সহায়তা করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
গত বুধবার হাসপাতালের সামনে কথা হয় অটোরিকশাচালক লাভলু সরদারের সঙ্গে। মাসখানেক আগে তিনি মাকে নিয়ে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। চোরেরা তাঁর গলা থেকে দেড় ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন নিয়ে যায়। গত রোববার তিনি এসেছিলেন স্ত্রীকে নিয়ে। তাঁর কাছ থেকেও মোবাইল ফোন ও টাকা নিয়ে যায় চোরেরা। লাভলু সরদারের অভিযোগ, হাসপাতাল প্রশাসনকে মৌখিকভাবে চুরির বিষয়টি জানানো হলেও তারা বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে দিন দিন চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। তিনি হাসপাতালে রোগী নিয়ে এলে প্রায়ই চুরির কথা শুনতে পান। গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা হয়রানির ভয়ে চুরির ঘটনায় থানায় অভিযোগ করেন না। মৌখিক অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশের সদস্যরা নানা কথা জিজ্ঞাসা করেন। এতে ভড়কে গিয়ে আর থামামুখোও হন না তারা।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার কথা হয় ভেদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসানের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, হাসপাতালে চুরি ও ছিনতাইয়ের বিষয়ে বেশ কিছু মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। তবে লিখিত কোনো অভিযোগ বা জিডি হয়নি। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আগামীকাল থেকেই সাদা পোশাকের টহল পুলিশ হাসপাতাল এলাকায় থাকবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুমন কুমার পোদ্দার বলেন, ‘এক মাসে আমার কাছে বেশ কিছু চুরির অভিযোগ এসেছে। হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট থাকার সুযোগ নিচ্ছে চোর চক্র। তারা রোগী ও স্বজনের মালপত্র চুরি করছে।’ তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ঠিক হলে চুরি-ছিনতাই বন্ধ হয়ে যাবে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনকে এ বিষয়ে তারা বারবার সতর্ক করেন। নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটেছে।
- বিষয় :
- চোর
