ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মানবতা

অসহায়ের সহায় পাগলা হোটেল

অসহায়ের সহায় পাগলা হোটেল
×

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, মানসিক ভারসাম্যহীন, ভিক্ষুকসহ অসহায় ব্যক্তিদের বিনামূল্যে খাবার খাওয়ান কুড়িগ্রামের উলিপুরের রনজু মিয়া। সম্প্রতি তোলা সমকাল

মোন্নাফ আলী, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪১ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাগলা হোটেল, প্রো. মো. রনজু মিয়া। সব ধরনের টাটকা খাবার পাওয়া যায়। সাইনবোর্ডে এসব তথ্যের সঙ্গে লেখা, প্রতি শুক্রবার অসহায় ও ভিক্ষুকদের বিনামূল্যে খাওয়ানো হয়। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা।

নিজের হোটেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, মানসিক ভারসাম্যহীন, ভিক্ষুকসহ দুস্থদের ডেকে এনে খাবার খাওয়ান কুড়িগ্রামের উলিপুরের রনজু মিয়া। তাঁর এ পাগলামির কারণে স্থানীয়রা লাবনী হোটেলের নাম বদলে ‘পাগলা হোটেল’ সাইনবোর্ড টানিয়েছেন।

এখন প্রতি শুক্রবার উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের দীঘল হইল্যা গাজীপুর বাজারের এ হোটেলে দুই শতাধিক দুস্থ মানুষ একবেলা পেট পুরে খাবার খাচ্ছেন। গত শুক্রবার সরেজমিন প্রতিটি টেবিলে নারী-পুরুষকে খাবার খেতে দেখা যায়। তাদের বেশভূষা দেখলেই পরিচয় স্পষ্ট। নিজ হাতে পরিবেশন করছেন রনজু মিয়া। অনেকেই হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে তা দেখে রনজুকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন।

পঞ্চাশোর্ধ্ব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফজলুল হক ও মানসিক ভারসাম্যহীন ফুলবালা বললেন, ‘গ্যারামে অনেক বড় লোক আছে। হেরা দান করে না। রনজু গরিব হলেও দিল বড়া মানুষ। শুক্রবার করি আসি, শান্তি করি প্যাট ভরি খিচড়ি খাই। আর দোয়া করি।’

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, দুই দশক আগে নজির হোসেন ‘লাবনী হোটেল’ নামে গাজীপুর বাজারে ব্যবসা শুরু করেন। রনজু পড়ালেখার পাশাপাশি টুকটাক সহযোগিতা করতেন। এক পর্যায়ে রাজধানীতে গিয়ে ‘ঢাকা ফুড প্যালেস’ নামে বাংলা ও চায়নিজ রেস্টুরেন্টে কাজ নেন তিনি। হোটেলের মালিক সিয়াব হোসেন প্রতি শুক্রবার গরিব-দুস্থদের বিনামূল্যে খাবার খাওয়াতেন। তাঁর এ মহৎ উদ্যোগে প্রভাবিত হন রনজু।

২০২৩ সালে বাড়ি ফিরে বাবার হোটেলের দায়িত্ব নেন তিনি। নিজেও সিয়াব হোসেনের মতো দুস্থদের খাওয়ানোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বাদ সাধে অর্থ। তবে মাঝেমধ্যে রনজু হোটেলে ডেকে এনে দু-চারজন ভবঘুরে, প্রতিবন্ধী ও ভিক্ষুককে খাওয়াতে থাকেন।

একদিন বিষয়টি নিয়ে স্ত্রী আছিয়া বেগমের সঙ্গে আলাপ করেন রনজু। নিঃসন্তান এ দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন, প্রতিদিনের রোজগার থেকে ৩০০ টাকা মাটির ব্যাংকে জমাবেন। সপ্তাহ শেষে তা দিয়ে দুস্থদের খাওয়াবেন। গত বছর থেকে আছিয়া রান্না করেন এবং তা দুস্থদের মধ্যে পরিবেশন করছেন রনজু।

এলাকাবাসী শুরুতে একে পাগলামি বলে সমালোচনা করলেও কান দেননি রনজু-আছিয়া দম্পতি। শুক্রবার মাইকিং করে লোক ডেকে এনে খাওয়াতে থাকেন। এখন এলাকার মানুষই সাইনবোর্ড বানিয়ে ‘পাগলা হোটেল’ করেছেন। সবার মুখে মুখে ফিরছে রনজুর মহৎ উদ্যোগ।

শুধু তাই নয়, হাঁটতে-চলতে পারে না এমন মানুষ রিকশা কিংবা ভ্যানে করে হোটেলে এলে ভাড়া দিয়ে দেন রনজু। যদিও তাঁর এসব কাজে অন্য হোটেল ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে। তারা নানাভাবে রনজুর কার্যক্রম বন্ধের চেষ্টা করছেন।

রনজু মিয়া সমকালকে জানান, ছোটবেলা থেকে তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভালোবাসেন। অভাবীদের খাইয়ে আনন্দ পান। বর্তমানে প্রতি শুক্রবার চাল-ডাল, সবজি ও মুরগির মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। সব মিলে আড়াই হাজার টাকায় ২০০ জনকে খাওয়াতে পারছেন।

তিনি বলেন, আমার এ কাজ যেমন অনেকের অপছন্দ; তেমনি বহু মানুষ প্রশংসা করেন। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, অসহায়-দুস্থদের পাশে থাকব। আল্লাহ সম্পদ দিলে বড় পরিসরে প্রতিদিন আরও ভালো মানের খাবার খাওয়ানোর ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান রনজু।

আরও পড়ুন

×