দিনে নিস্তব্ধ, রাতে মহড়া ককটেল বিস্ফোরণ
রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে অস্থির জনপদ মুন্সীগঞ্জের মোল্লাকান্দি
কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, মুন্সীগঞ্জ
প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৪ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মুন্সীগঞ্জ সদরের মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন এখনও অশান্ত। দিনে নিস্তব্ধ নীরবতা, রাত হলেই ককটেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিবদমান ইউনিয়ন বিএনপির দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকরা নিজ নিজ এলাকায় রাতভর দেন মহড়া।
২ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত এই দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ভোরে দুই বিএনপি কর্মী আরিফ মীর হত্যা মামলার আসামি অহিদ হোসেনকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে র্যাব-১১। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার পাঠানটুলি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অহিদ বড় মোল্লাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। র্যাব-১১ কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মো. নাঈম উল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অহিদ হোসেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতাউর রহমান আতিক মল্লিক ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অহিদ মোল্লার অনুসারী।
এক বছরে ১০ বার সংঘর্ষ
২ নভেম্বর নিহত হন তুহিন দেওয়ান। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতাউর রহমান আতিক মল্লিক ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অহিদ মোল্লার অনুসারী। এরপর ১০ নভেম্বর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন আরিফ মীর। পরদিন হাসপাতালে মারা যান গুলিবিদ্ধ রায়হান খান। তারা সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আলী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লার অনুসারী।
গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে স্থানীয় বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই পক্ষের বিরোধের জের ধরে গত এক বছরে অন্তত ১০ দফা সংঘর্ষ হয়েছে। সর্বশেষ হামলা ও সংঘর্ষে ৯ দিনের ব্যবধানে প্রাণ হারালেন তিনজন।
এদিকে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সদর উপজেলার চরাঞ্চলের এ ইউনিয়নের গ্রামগুলোর বাসিন্দারা যেন অজানা আশঙ্কায় থমকে গেছেন। লোকজন চলাচল কমে গেছে। মুন্সীকান্দি, বেহেরকান্দি, পশ্চিম মাকহাটী, পূর্ব মাকহাটী, মহেশপুর, রাজারচর, চরডুমুরিয়া, আমঘাটা গ্রাম ঘুরে এমনটি দেখা গেছে। গ্রামগুলোর পুরুষরা গ্রেপ্তার এড়াতে দিনে গা-ঢাকা দিয়ে থাকছেন। রাতে ফিরছেন নিজ বাড়িতে। অনেকেই দূরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
২ নভেম্বর রাতে তুহিন হত্যাকাণ্ডের পর আতিক মল্লিক ও অহিদ মোল্লা পক্ষের অনুসারীদের চরডুমুরিয়া গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেন প্রতিপক্ষ উজির আলী ও আওলাদ হোসেন মোল্লার অনুসারীরা। এরপর থেকে ১০ দিন ধরে চরডুমুরিয়ার অর্ধশতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী গ্রামছাড়া হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।
গ্রামবাসী জানায়, বিতাড়িত নেতাকর্মীরা ৯ নভেম্বর রাতে চরডুমুরিয়া গ্রামে নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করলে বাধা দেন প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে রাতভর মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে ১০ নভেম্বর ভোরে দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। সকাল পর্যন্ত দফায় দফায় গোলাগুলিতে লিপ্ত হন তারা। এ সময় আতিক মল্লিক ও অহিদ মোল্লা পক্ষের অনুসারীদের গুলিতে নিহত হন উজির আলী ও আওলাদ হোসেন মোল্লার অনুসারী আরিফ মীর। গুলিবিদ্ধ হয়ে পরদিন মারা যান রায়হান খান।
জানা গেছে, দুই পক্ষের লোকজন নিজেদের চেনার জন্য দুই ধরনের টিশার্ট পরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ১০ নভেম্বর সকালে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে বিএনপি কর্মী আরিফ মীর নিহতের ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে সদর থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে ওইদিন রাতে চরডুমুরিয়া গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে আরিফকে দাফন করা হয়। এ ছাড়া একই দিন সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ রায়হান খান মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার রাতে স্বজনদের কাছে তাঁর লাশ হস্তান্তর করা হয়।
সংঘর্ষ ও প্রাণহানির পর থেকে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে পুলিশ টহল দিচ্ছে। তারা মূলত গ্রামগুলোর মূল সড়ক ও বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, বিবদমান পক্ষগুলোর নেতাকর্মীরা গ্রামের আনাচে কানাচে মহড়া দেন। পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই নিজেদের শক্তি জানান দিতে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। এ বিষয়ে সদর থানার ওসি এম সাইফুল আলম বলেন, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের চরডুমুরিয়া বাজার ও মাকহাটী বাজার এলাকায় পুলিশের টিম অবস্থান করে টহল দিয়ে থাকে। কয়েকটি গ্রামের যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় সেখানে টহল দেওয়া সম্ভব হয় না।
ওসি জানান, পৃথক ঘটনায় গুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় এ পর্যন্ত দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। যেহেতু একই ঘটনায় আরিফ মীর ও রায়হান খান মারা গেছেন, তাই আরিফ হত্যা মামলার সঙ্গে রায়হান হত্যার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এজন্য পৃথক মামলা রুজু করা হয়নি। এটি জোড়া হত্যা মামলা বলা যায়। ওসি বলেন, ১০ নভেম্বরের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ শাকিল ঢালী ও জিহাদ হোসেন নামে দুজনকে আটক করেছে। মামলার আসামিরা পলতক, তাই গ্রেপ্তারে বিলম্ব হচ্ছে।
বিএনপি দায় নেবে না
সংঘর্ষে প্রাণহানির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিন বলেন, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে সংঘটিত একের পর এক সহিংস ঘটনা বিএনপির দলীয় বা রাজনৈতিক সহিংসতা নয়। ব্যক্তিস্বার্থে ইউনিয়নের আধিপত্য নিয়ে এসব সহিংসতা হচ্ছে। তাই এর দায় বিএনপি নেবে না। তিনি বলেন, ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে যারা বিএনপির ভাবমূর্তির বিনষ্ট করছে, তাদের গ্রেপ্তার করতে আমরা পুলিশ সুপারকে বলেছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি। তাতে বিএনপির পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ থাকবে না।
জেলা পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার বলেন, মোল্লাকান্দির সাম্প্রতিক ঘটনায় পুলিশ সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সংঘাতের সঙ্গে জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তারে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য করণীয় সব কিছু করা হবে।
- বিষয় :
- ককটেল
- বিএনপি
- দ্বন্দ্ব
- ককটেল বিস্ফোরণ
