ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি

কমিটির বিরোধে ১২০০ কর্মী দুই বছর বেতন পাচ্ছেন না

কমিটির বিরোধে ১২০০ কর্মী দুই বছর বেতন পাচ্ছেন না
×

বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি (এফপিএবি)

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৪ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির (এফপিএবি) প্রায় এক হাজার ২০০ কর্মী দুই বছর ধরে বেতন পাচ্ছেন না। অবসরেও যেতে হচ্ছে খালি হাতে। কমিটির বিরোধ নিয়ে সমিতির বিক্ষুব্ধ শতাধিক কর্মী গত আগস্টে রাজধানীর বিজয়নগর কালভার্ট রোডের প্রধান কার্যালয় দখলে নেন। এর পর থেকে তারাই নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে জরুরি চিকিৎসা ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

তিন বছরের নির্বাচিত কমিটির মাধ্যমে এফপিএবি পরিচালিত হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে বিনা ভোটে কমিটি দখল করা হয়। এর সঙ্গে তৎকালীন কমিটির শীর্ষ পদধারীদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থায়ন বন্ধ করে দাতা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশন (আইপিপিএফ)।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অর্থায়ন বন্ধের পরই সংকটে পড়ে এফপিএবি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। গত বছরের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পরও প্রতিষ্ঠানটিতে অস্থিরতা চলতে থাকে। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ আমলের পথে হেঁটে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর বিনা ভোটে কমিটি হয়। এতে সমস্যা আরও জটিল হয়।

অচলাবস্থা নিরসনে গত ১৩ সেপ্টেম্বর, ৮ অক্টোবর ও সর্বশেষ ১ নভেম্বর আহ্বান করার পরও সাধারণ সভা হয়নি। নিরাপত্তার অজুহাতে সভাপতিসহ কমিটির পদধারীরা আসেন না। সম্প্রতি অর্থ তছরুপসহ বিভিন্ন অভিযোগে বর্তমান কমিটি বাতিলের দাবিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরে আবেদন দিয়েছেন কর্মীরা।

অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করে অধিদপ্তর। তদন্ত কমিটির সদস্য সমাজসেবা ঢাকা সদর কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (কার্যক্রম-১) রবিউল ইসলাম সমকালকে জানান, চলতি মাসের শুরুতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এফপিএবি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার নিয়ে কাজ করে। ২১ জেলায় ৪০০ স্থায়ী ও অস্থায়ী ৮৫০ কর্মী রয়েছেন। ১১ জেলায় নিজস্ব ভবনসহ কয়েকটি জেলায় রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক। আইপিপিএফ বছরে ১২ কোটি টাকা দিত প্রতিষ্ঠানটিকে।

কমিটির লোভে ডুবল প্রতিষ্ঠান
২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত একাধিক মেয়াদে কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকি। এরপর সভাপতি হন চুমকির স্বামী মাসুদুর রহমান।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সৈয়দ মোর্শেদকে সভাপতি ও মজিবর রহমানকে মহাসচিব করে নতুন কমিটি হয়। অবৈধ দাবি করে এ কমিটি বাতিলে মাঠে নামেন মাসুদুর রহমান। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর বিনা ভোটে সভাপতি হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মসয়ুদ মান্নান ও মহাসচিব ডা. জেসমিন আখতার। বকেয়া বেতনসহ কর্মীদের আন্দোলনের মুখে গত ২৫ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন মসয়ুদ। নতুন সভাপতি হন আগের কমিটির সহসভাপতি হারুন অর রশিদ। বৈধভাবে সভাপতি হননি দাবি করে অন্যরা তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেন। ফলে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সভা করতে পারেননি।

জামালপুর শাখার জাতীয় কাউন্সিলর শেলীনা বেগম সমকালকে বলেন, মসয়ুদের পদত্যাগের পর গত ৮ অক্টোবর দুপুর ২টায় প্রধান কার্যালয়ে সভা আহ্বান করা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও আমি কাউকে পাইনি। পরদিন চিঠিতে জানানো হয়, সভায় হারুন সভাপতি হয়েছেন। তিনি বলেন, সভা আহ্বান করা হয় প্রধান কার্যালয়ে। অথচ চিঠিতে জানানো হয়, উত্তরায় সভা থেকে হারুন সভাপতি হয়েছেন। এটি সুস্পষ্ট জালিয়াতি।

ঢাকা জেলার সহকারী কর্মকর্তা হিরণ মিয়া বলেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্লকড। বকেয়া পরিশোধ, কমিটি বাতিল ও দুর্নীতিবাজদের অপসারণ ছাড়া আমরা প্রধান কার্যালয়ের দখল ছাড়ব না।

এ ব্যাপারে সভাপতি হারুন বলেন, ‘একদল কর্মী কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলে রাখায় স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তারাই বর্তমান কমিটি বাতিল চেয়ে অ্যাডহক কমিটি সমাজসেবায় জমা দিয়েছে। তাদের কারণেই জটিলতা বেড়েছে।’ গঠনতন্ত্র মেনে সভাপতি হয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘জানুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়ে আমি পাঁচ মাসের বকেয়া দেওয়ার উদ্যোগ নিই। কিন্তু আগের সভাপতি ব্যাংক হিসাব স্থগিত করায় তা হচ্ছে না।’ একাধিক সভা আহ্বান করলেও বিরূপ পরিবেশের কারণে প্রধান কার্যালয়ে তা করতে না পারার কথা স্বীকার করেন সভাপতি।

আরও পড়ুন

×