ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বড়চরের পাহাড়ি টিলা কেটে সাবাড় ঝুঁকির মুখে দেড় লাখ বাসিন্দা

বড়চরের পাহাড়ি টিলা কেটে সাবাড় ঝুঁকির মুখে দেড় লাখ বাসিন্দা
×

নবীগঞ্জের বড়চরে বেপরোয়া টিলা কেটে সাবাড় করছে স্থানীয় মাটি ব্যবসায়ী চক্র। ঝুঁকিতে পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি, দুর্ঘটনার শঙ্কায় স্থানীয়রা সমকাল

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নবীগঞ্জ উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল দিনারপুরে অবাধে চলছে পাহাড়ের টিলা কাটার মহোৎসব। স্থানীয়রা বলছেন, আগের মতোই রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে লালিত ব্যক্তিরাই এসব টিলা কাটার চক্র গড়ে তুলেছে। প্রশাসন অভিযান চালালে কিছুদিন বন্ধ থাকে তাদের কাজ। এরপর আবার শুরু হয়।
দিনারপুর ঘুরে দেখা যায়, গজনাইপুর ও পানিউমদা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি পাহাড় ও টিলা কাটা হচ্ছে; যার মধ্যে সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পানিউমদা ইউনিয়নের বড়চর পাহাড়। স্থানীয় একটি চক্র আগের কায়দায় পাহাড় কেটে এই মাটি পাচার করছে।

উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়–অভিযান, মামলা, জরিমানা আদায় ও গ্রেপ্তার করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। মূলহোতারা নাগালে না আসায় পাহাড়লুট থামানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এই চক্রের অনেকের নাম-পরিচয় জানলেও প্রকাশ করতে ভয় পান স্থানীয়রা। তারা প্রশাসনের কথা আমলে না নিয়ে বেপরোয়াভাবে টিলা কেটে সাবাড় করছে।

পাহাড়ি অঞ্চল অধ্যুষিত দিনারপুর এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে বড়চরের পাহাড়ের টিলার অবস্থান। এছাড়া এলাকাজুড়েই রয়েছে ছোট-বড় টিলা। এখানে বসবাস করেন প্রায় ২ লাখ মানুষ। অবৈধ পাহাড় কর্তন ও মাটি লুটের কারণে এর মাঝে সরাসরি পাহাড়ধসের হুমকির মুখে রয়েছেন প্রায় দেড় লাখ বাসিন্দা; যাদের মাঝে ৭০ হাজার ভোটার। বেপরোয়া টিলা কাটায় এখানকার বাসিন্দাদের বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও পল্লী বিদ্যুতের খুঁটিগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলের বনের আয়তন দ্রুত কমতে থাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে।
স্থানীয়রা জানান, রাতের বেলায় শুধু নয়, দিনদুপুরে পাহাড়ের মাটি লুট করে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় চক্রটি। বিগত সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতারা যেভাবে নিজেরা আড়ালে থেকে সিন্ডিকেট গড়ে পাহাড় লুট করত, একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে এখন। টিলা কেটে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ফেলা হচ্ছে। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও রাতের আঁধারে এসব পাহাড়ের মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ পাহাড় কেটে সমতল করে ফসলি জমি বা বসতি স্থাপন করছেন অবৈধভাবে দখলে নিয়ে। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার দায়ে জরিমানা ও জেল দিলেও থামছে না এই অপকাণ্ড। 
পরিবেশবাদীরা বলছেন, পাহাড় কাটার কারণে দিনারপুরে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। এভাবে পাহাড় কাটার কারণে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তারা।

সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, নবীগঞ্জ উপজেলার বড়চর পাহাড়ি এলাকার প্রভাবশালী শাহ্‌ রকিব মিয়া, আবুল ফজল মিয়া ও গোলাম মোস্তফা চক্র এবং একই এলাকার ফজল মিয়া পাহাড়ের মাটি লুটের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। অবৈধভাবে সরকারি টিলার মাটি কেটে নেয় তাদের লোকজন।

সম্প্রতি মেহের উল্ল্যার দখলে থাকা সরকারি টিলায় রাতে ও দিনে ভেকু মেশিন লাগিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে মাটি। এই মাটি বিক্রির করা হচ্ছে; যা চড়া দামে কিনে নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী দারাজ মিয়া নামের এক ব্যক্তি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দারাজ মিয়া বলেন, জরুরি কাজের জন্য তিনি মাটি কিনছেন। যারা মাটি বিক্রি করছে তারা কোথা থেকে মাটি আনছে সেটি তাঁর জানা নেই।

এছাড়া এখানকার একটি পাহাড়ের টিলা কেটে শাহ রকিব মিয়া নামের এক ব্যক্তি নিজের নিচু জমি ভরাট করেছেন। তিনি বলেন, নিজের মালিকানাধীন জমিতে থাকা টিলা কেটেছেন। এ জন্য কারও অনুমতির প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
এই শাহ রকিব আলী টিলা কাটার সময় পল্লী বিদ্যুতের একটি খুঁটির গোড়া থেকে এমনভাবে মাটি খুঁড়ে তুলেছেন, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। বিদ্যুতের খুঁটির আশপাশে বসবাসকারীরা বলছেন, যে কোনো সময় এটি উপড়ে পড়তে পারে। তাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায় কে নেবে?
এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতের নবীগঞ্জ ও বাহুবল জোনাল অফিসের কর্মকর্তারা জানান, তারা ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ নিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা আমলে নেয়নি। নবীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান অনুজ বলেন, এই বিষয়ে খবর পেয়ে বাহুবল পল্লী বিদ্যুৎ অফিসকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

বাহুবল পল্লী বিদ্যুতের এজিএম অমলেশ সরকার জানান, সেখানে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উচ্চ পর্যায়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গোড়া থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় খুঁটি হেলে পড়েছে। যারা পাহাড় কাটছে তাদের ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও নবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন বলছে, কে পাহাড় ও টিলা কাটছে তা তাদের জানা নেই। প্রশাসনের এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ স্থানীয়দের একাংশ। তারা বলছেন, পাহাড়, নদী, বন, বাগান যাই হোক–কারা লুটে খায় প্রশাসন কখনোই জানে না আর দেখে না। 
এ বিষয়ে পানিউমদা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইজাজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর ইউনিয়নের বেশকিছু লোক প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটছে। এসব বিষয়ে প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলাও হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমীন জানান, পাহাড় কাটার খবর পেলেই তারা অভিযান চালান। বিভিন্ন সময় জেল জরিমানাও করা হচ্ছে। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×