ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিষিদ্ধ এয়ারগানে পাখি নিধন চলছে এখনও

রাজশাহীতে শিকারি চক্র সক্রিয়

নিষিদ্ধ এয়ারগানে পাখি নিধন চলছে এখনও
×

শিকার করা পাখি। ছবি: সমকাল

সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫২

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এয়ারগান আমদানি, বিক্রয় ও ব্যবহার ২০২১ সালে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে সরকার। লক্ষ্য ছিল, বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে পরিযায়ী পাখি শিকারে রাশ টানা। তবে চার বছরেও মাঠ পর্যায়ে আইনটির বাস্তবায়ন করা যায়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে পুরোনো এয়ারগান থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশনাও ছিল। তবে মাঠ পর্যায়ে সেই নির্দেশনা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 

পাখি নিধনের অন্যতম বড় মাধ্যম এয়ারগান। এতে আহত পাখির বেশির ভাগই বাঁচে না। বিশেষ করে শীতকালে যখন হিমালয় অঞ্চলের পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশের বিল-বাঁওড়ে আশ্রয় নেয়, তখন এই শিকারিরাই তাদের সবচেয়ে বড় হুমকি। 

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৭) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার বা বিক্রি করলে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। তবে রাজশাহী অঞ্চলে এই আইনে কোনো মামলা বা অভিযানের তথ্য পাওয়া যায়নি। 

নিষেধাজ্ঞা কাগজেই সীমাবদ্ধ

গত ৮ নভেম্বর রাজশাহীর চারঘাটের ভাটপাড়া বিলে গিয়ে দেখা যায়, ধানক্ষেত ও বিলের পানিতে বক, পানকৌড়ি, ঘুঘুসহ নানা প্রজাতির পাখি খাবারের খোঁজে এসেছে। পাশেই দুদল শিকারি এয়ারগান তাক করে বসে আছে। কাছে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তারা ছবি তুলতে নিষেধ করে। এ সময় তাদের ব্যাগে বক, পানকৌড়ি, ঘুঘুসহ পাঁচটি পাখি গুলিতে আহত ও জবাই অবস্থায় দেখা যায়। 

এয়ারগান হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন চারঘাটের ভাটপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ বিজয়। তিনি বলেন, ‘এয়ারগান ব্যবহার নিষিদ্ধ কিনা জানা নেই। এয়ারগানটি পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র মামুন খানের। শখের বসে পাখি শিকারের জন্য তাঁর কাছে থেকে এয়ারগানটা এনেছি।’

এয়ারগানের বিষয়ে জানতে চাইলে মামুন খান বলেন, ‘এয়ারগানের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’ এ কথা বলে ফোন কেটে দেন। 

গত ৫ নভেম্বর বাঘার বাজুবাঘা ইউনিয়নের নওটিকা বিলে পাখি শিকারির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান স্থানীয় কৃষকরা। স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, নওটিকা বিলে শীতের শুরুতে দেশি ও পরিযায়ী পাখি আসতে শুরু করেছে। এর মধ্যে শিকারিরা এয়ারগান দিয়ে নির্বিচারে পাখি মারছে। কয়েক দিন আগে বাঘা বাজারের মনিহার স্টুডিওর মালিকের ছেলে রিপন আলীসহ কয়েকজন এয়ারগান নিয়ে পাখি শিকার করতে এলে স্থানীয় কৃষকরা বাধা দেন। এক পর্যায়ে তাদের ধাওয়া দিয়ে বিল থেকে বের করে দেওয়া হয়। 

এয়ারগান দিয়ে পাখি শিকারের বিষয়ে রিপন আলী বলেন, ‘নওটিকা বিলে অনেক পাখি আসে। তবে কোনো সময় শিকার করতে যাইনি। আমাদের একটা এয়ারগান আছে, সেটা বাড়িতেই পড়ে আছে। যারা আমার কথা বলেছে, তারা মিথ্যা বলেছে।’

পুঠিয়ার দীঘলকান্দি এলাকার রুহুল আমিন বলেন, ‘প্রতিদিন ভোরে আশপাশের বিলগুলোতে এয়ারগান নিয়ে বিভিন্ন দল পাখি শিকারে আসে। সাধারণ মানুষ নিষেধ করলে এয়ারগান দিয়ে ভয় দেখায়। তারা পাখি মেরে ব্যাগ ভরে নিয়ে যায়। অনেক সময় স্থানীয়দের কাছে বিক্রিও করে।’ 

জনসচেতনতা ও টহল বাড়ানোর দাবি 

পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু আইন করলেই হবে না, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। রাজশাহীর বিভিন্ন বিলে মৌসুমভিত্তিক বিশেষ টহল দল গঠন করা গেলে অনেকাংশে এ শিকার রোধ করা সম্ভব।
তরুণ প্রকৃতিপ্রেমী সংগঠন সবুজ পৃথিবীর রাজশাহীর সভাপতি শাহিনুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রতি শীতেই বিলের পাখিদের ছবি তুলতে যাই, কিন্তু এখন শিকারিদের দেখে ভয় পাই। তারা দল বেঁধে আসে। অনেক সময় বাধা দিতে গেলে তারা এয়ারগান নিয়ে তেড়ে আসে। এ জন্য স্থানীয় তরুণ নিয়ে বিলগুলোতে টহল দল গঠন করা উচিত।’ 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান বলেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই বিল থেকে হারিয়ে যাবে পাখির কলরব। 

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েসের চারঘাট উপজেলার আহ্বায়ক শাহাদাতুজ্জামান রিমন বলেন, এয়ারগান এখনও অনেকের ঘরে লুকানো আছে। শীত এলেই তারা নিয়ে মাঠে নামে। স্থানীয় প্রশাসন চাইলে সহজেই শনাক্ত করতে পারে। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, নির্বিচারে পাখি হত্যা আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। তাই পাখি রক্ষায় সচেষ্ট থাকতে হবে। এয়ারগানের বিষয়ে যে আইন আছে, তা কঠোরভাবে মানতে হবে। 

চারঘাট-বাঘা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. খালেদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

আরও পড়ুন

×