বাবার ছবি নিয়ে দপ্তর থেকে দপ্তরে ঘুরছে ছোট্ট সাফিয়া
নিখোঁজ বাবা আলী আকবরের খবর জানতে নৌ পুলিশ থানায় সম্প্রতি স্বজনের সঙ্গে বাবার ছবি হাতে শিশু সাফিয়া। দুই মাসেও কোথাও মিলছে না বাবার খবর সমকাল
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাফিয়া জান্নাতের বয়স ৮। চট্টগ্রাম নগরের একটি মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাবার সঙ্গে খুনসুটি করা, বেড়ানোর মধ্যেই তার অনেকটা সময় কাটার কথা। কিন্তু দুই মাস ধরে বাবার আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ তার বাবা আলী আকবর। একই সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছেন আরও ১৭ জন। এরপর থেকেই আলী আকবরের ছবি হাতে মা ও ভাইদের সঙ্গে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে যাচ্ছে সাফিয়া। তবে পাচ্ছে না কোন ভালো সংবাদ। আব্বু, আব্বু বলে প্রায়ই কান্নাকাটি করে সে।
সাফিয়া বলে, ‘সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে আব্বু বলে শেষবারের মতো ডেকেছিলাম। আব্বুকে ছাড়া খুব কষ্টে সময় কাটছে।’ এসব বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। আলী আকবরের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। এক ছেলে অনার্সে পড়েন। আরেকজন এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ায় পশ্চিম কোনাখালীতে। চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার মোহাম্মদপুরের খতিবের হাট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর নগরীর নতুন ফিশারিঘাট থেকে ‘এফ বি খাজা আজমীর’ নামের ফিশিং বোট নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ১৮ জন নিখোঁজ হন। আলী আকবর বোটটির মালিক। ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর স্ত্রী সেলিনা আক্তার চট্টগ্রামের সদরঘাট নৌ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। ট্রলারের ১৮ জনের মধ্যে আছেন কক্সবাজার পৌর সদরের নুনিয়াছড়ার ছয়জন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বড়ঘোনা এলাকার দুইজন। অন্যরা কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। পরিবারগুলোর লোকজনের দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়।
১৩ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১০টার দিকে শেষবারের মতো স্বামীর সঙ্গে কথা হয় সেলিনার। দোয়া গইজ্জ্যো (দোয়া করো) এটাই ছিল আলী আকবরের শেষ কথা। এরপর থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ, ট্রলারও নিখোঁজ। এবারই প্রথম তিনি সাগরে যান বলে জানান সেলিনা। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই স্বজনের খোঁজে নৌ থানাসহ এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে যাচ্ছেন নিখোঁজদের পরিবার সদস্যরা। তবে কোনো তথ্যই দিতে পারছে না নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীসহ কেউ।
এ প্রসঙ্গে সেলিনা আক্তার বলেন, ‘দেশে এত এত সরকারি সংস্থা, কিন্তু কারও কাছেই নেই নিখোঁজদের ব্যাপারে কোনো খবর। প্রতিদিন আমি ও সন্তানরা অপেক্ষায় থাকি। আমাদের দিন, মুহূর্ত কীভাবে কাটছে তা কেবল আল্লাহ জানেন।’ তাঁর ছোট ছেলে আহাদুল ইসলাম বলেন, ‘আব্বুর সঙ্গে ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আমার শেষ কথা হয়। পরদিন ফোন বন্ধ পাই। পরে শতবার ফোন করেও সাড়া পাইনি। আব্বুই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম।’
বাঁশখালী গন্ডামারা এলাকার নিখোঁজ আমির হোসাইনের বাবা রিদোয়ান বলেন, ‘ঘটনার এতদিন পরও তাদের উদ্ধারে সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। ছেলের খবর না পেয়ে চরম দুশ্চিন্তায় সময় কাটছে।’ ছেলে হেলালের সন্ধানে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে আসা মো. সিদ্দিক বলেন, ‘পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম হেলাল। তার ঘরে রয়েছে দুই বছর ও সাত মাস বয়সী দুই সন্তান। সে না থাকায় চরম আর্থিক কষ্টে পড়েছে পরিবার।’ নিখোঁজ জামাল আহমদের মা বুলবুল আকতার বলেন, ‘ছেলেটা কোথায় আছে কিছুই জানতে পারছি না। বাবা বাবা বলে প্রায়ই কান্নাকাটি করে জামালের দুই শিশু সন্তান।’ নিখোঁজ রুবেলের বোন কামরুন্নাহার বলেন, ‘রুবেলের একমাত্র সন্তানের বয়স একবছর। প্রতিমুহূর্তে বাবাকে খোঁজে সে।’
এ প্রসঙ্গে নৌ পুলিশ সদরঘাট থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়েছি। বিষয়টি কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং বিজিবিকেও অবহিত করেছি। তবে নিখোঁজদের ব্যাপারে কোনো খবর পাইনি। ১৮ জেলেকে মিয়ানমার বাহিনী বা অন্য কেউ নিয়ে গেছে কিনা কিছুই বুঝতে পারছি না। ট্রলারটি সাগর থেকে নিখোঁজ হওয়ায় আমাদের কিছুই করার নেই।’ কোস্টগার্ড চট্টগ্রাম পূর্ব জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মো. সাকিব বলেন, ‘১৮ জেলে নিখোঁজের পর আমরা ২০ থেকে ২৫ দিন অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু কোথাও তাদের হদিস মেলেনি।’ সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘটনাটি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
- বিষয় :
- বিচারপ্রার্থী
