বাজার নেই, তবু জনশূন্য প্রান্তরে আড়াই কোটির মার্কেট ভবন
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের হাটখোলা এলাকায় জনশূন্য জায়গায় পড়ে আছে আড়াই কোটি টাকার মার্কেট ভবন সমকাল
ইজাজ আহ্মেদ মিলন, গাজীপুর
প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্জন এক গ্রামীণ প্রান্তর। কোলাহলমুক্ত সে প্রান্তরে আনাগোনা নেই মানুষের। নেই কোনো দোকানপাট। এমন এক জনশূন্য জায়গায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। সেই কাজও থমকে আছে দেড় বছরের বেশি সময়। নাগরিকের করের অর্থের এমন অপচয় হচ্ছে গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের হাটখোলা এলাকায়।
প্রথমে এখানে চারতলা মার্কেট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে নির্মাণকাজ শুরু হয় দোতলা ভবনের। এ ভবন নির্মাণের মেয়াদও পেরিয়ে গেছে গত বছরের ১৮ মার্চ। কাজ না করে ফেলে রাখা হয়েছে ভবনটি! দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে পড়ে থাকা নির্মাণাধীন ভবনটির খোঁজও নেয়নি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। পরিত্যক্ত ভবনে এখন রাতের বেলায় বসছে মাদকসেবীসহ অপরাধীদের আড্ডা।
গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (সিআরএমআই) নামে একটি প্রকল্প রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি)। এর আওতায় দেশের অন্যান্য জেলার মতো গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানের হাটবাজারে আধুনিক মার্কেট ভবন নির্মানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই একটি হচ্ছে পিরুজালীর হাটখোলা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সেখানে মার্কেট ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় দুই কোটি ৫৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা। তবে কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে। এমএসটি স্টার জেভি নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তারা কাজ শেষ না করেই চলে গেছে।
হাটখোলা এলাকা দিয়ে বয়ে গেছে হোতাপাড়া-ফুলবাড়িয়া সড়ক। এর পাশেই সরকারি জায়গায় নির্মাণাধীন মার্কেট ভবনটি। গ্রামের বসতি এটির আধা কিলোমিটার দূরত্বে। স্থানীয় লোকজন জানান, এক সময় হাটখোলায় হাট বসত। পিরুজালীর লোকজন এখন আশপাশের মির্জাপুর বাজার, মণ্ডলবাড়ি বাজার ও মণিপুর বাজারে যান। ফলে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে হাটখোলায় হাট বসে না।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কেন জনশূন্য এমন স্থানে এত টাকা খরচ করে ভবন করা হচ্ছে? গাজীপুর সদর উপজেলার এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী ও প্রকল্পটির তদারক কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, অনেক আগেই ভবনটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২৩ সালের ১৫ মে কাজ শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ। কিন্তু কেন এমন নির্জন জায়গায় এত টাকা খরচে এমন ভবন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল– তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, আমি সরকারি চাকরি করি। যা নির্দেশ পাই, তা-ই বাস্তবায়ন করি। আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। ভবনের ১০ ভাগ কাজ এখনও বাকি বলে জানান তিনি।
একটি সূত্র বলছে, আধুনিক মার্কেট ভবন নির্মাণে সরকার বরাদ্দ দিলেও গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘিরবাজার, মণিপুর বাজার, ভবানীপুর বাজার ও হোতাপাড়া বাজারের মতো বিভিন্ন প্রাচীন ও ব্যস্ততম হাট-বাজারে ভবন করার মতো জায়গা নেই। এ অবস্থায় বরাদ্দের টাকা হাতছাড়া না করতেই জনশূন্য হাটখোলা এলাকায় ওই ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূলত এর আড়ালে লুটপাটই ছিল উদ্দেশ্য।
সম্প্রতি হাটখোলা গিয়ে দেখা যায়, ভবনের দুইতলার কাজ হলেও এখনও অনেক কাজ বাকি। মূল ভবনের কাঠামো তৈরি হলেও প্লাস্টার, চুনকাম, স্যানিটেশন, জানালা-দরজা লাগানোসহ অনেক কাজই বাকি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএসটি স্টার জেভির কর্ণধার আবদুল কাদিরকে ফোন দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়। এলজিইডির গাজীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মুহাম্মদ ফারুক হাসান সমকালকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা হয়েছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তারা পুনরায় কাজ শুরু করবে বলে কথা দিয়েছে।
গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছি। উপজেলা প্রকৌশলীকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি।
- বিষয় :
- ভবন
