ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ডাক দিলেই ছুটে আসে বক

ডাক দিলেই ছুটে  আসে বক
×

হোমনায় বক হাতে আবুল কাশেম ভূঁইয়া সমকাল

জুনায়েদ আহমেদ তিতাস, হোমনা (কুমিল্লা)

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুমিল্লার হোমনা উপজেলার হাভাতিয়া নদীর কূল ঘেঁষে মহিষমারী গ্রামের এক মাটির বাড়ি। তাঁর চারদিকে সবুজ, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মায়াময় সংসার। বকের ওড়াউড়ি, ঘুঘুর ডাকা, শালিকের কিচিরমিচির, খরগোশের কদমফুল ছোঁয়া দৌড়, কুকুর-বিড়ালের নিশ্চিন্তে ঘুম। এই প্রাণবৈচিত্র্যের কেন্দ্রবিন্দু আবুল কাশেম ভূঁইয়া। 

উত্তরে হোমনা উপজেলার মহিষমারী, দক্ষিণে তিতাসের পুরান বাতাকান্দি। এই দুই জনপদের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে হাভাতিয়া নদী। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে কাশেমের বাড়ি। প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই শুরু হয় এক অন্যরকম দৃশ্য। কাশেম বকের মতো ডাক দেন। মুহূর্তেই উড়ে আসে দুটো সাদা বক। কোনোটি তাঁর কাঁধে বসে, আবার কোনোটি হাতে। হাতের ছোট পাত্র তুলে কাশেম যখন এক মুঠো মাছ এগিয়ে দেন, পাখিগুলোর চোখে তখন অপার নির্ভরতার আলো। বক দুটি তিন মাস ধরে তাঁর কাছে আছে। অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া পাখিগুলোকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন তিনি।
আবুল কাশেম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি কোনো পাখিকে কখনো খাঁচায় রাখি না। অসুস্থ অবস্থায় পেলেই চিকিৎসা করি, আর সুস্থ হলেই ছেড়ে দিই মুক্ত আকাশে।’
তাঁর ঘরজুড়ে রয়েছে খরগোশ, বিড়াল, কবুতর, দেশি হাঁস, এমনকি অসহায় পথকুকুরও। কোনোটি অসুস্থ, কোনোটি পরিত্যক্ত, তবে কাশেমের বাড়িতে সবার জন্যই রয়েছে নির্বিঘ্ন আশ্রয়। ঘরের দক্ষিণ জানালার পাশে আমগাছের ডালে নিশ্চিন্তে ডিমে তা দিচ্ছে একটি ঘুঘু; মানুষের ভয়ে সে সরে যায় না, কারণ, সে জানে এই বাড়ির মানুষ প্রাণীর ক্ষতি করে না।

কাশেমের স্ত্রী নিলুফা বেগম কাঁঠালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাদের ছেলে নূরে আলম ভূঁইয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মেয়ে নুসরাত জাহান খাদিজা পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। তারাও কাশেমের এই প্রাণী সেবায় সহযোগী। মেয়ে নুসরাত জাহান খাদিজা বলে, ‘বন্ধুরা আমাদের বাড়িকে চিড়িয়াখানা বলে। কিন্তু আমরা এটাকে ভালোবাসার স্কুল মনে করি।’

টিনের চালা, মাটির মেঝে, কিন্তু অভাব নেই আনন্দের। অবসরে বসে দোতারা বা গিটার বাজান কাশেম, আধ্যাত্মিক গান গেয়ে সময় কাটান। তাঁর মতে, যারা প্রাণীকে ভালোবাসে তারা কখনও একা থাকে না।
প্রায় তিন দশক ধরে প্রাণীদের জন্য কাশেম যা করে চলেছেন, তার শুরুটা ছিল নাটকীয়। ১৯৯৩ সালের এক ঝড়ে বাড়ির পাশের মান্দার গাছ থেকে একটি বাসা পড়ে যায়। সেখানে থাকা ছানাগুলোকে কেঁচো খাইয়ে বড় করেন তিনি। সেই দিনই তার জীবনে বদলে যায় অনেক কিছু। সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ছানাগুলোকে দেখে মনে হয়েছিল আমরাও তো বাবাহারা। ওদের কষ্ট আর আমাদের কষ্ট একই মনে হয়েছিল।’

তিতাসের এক এলাকায় কিছু শিকারি বকের বাসা ভেঙে ছানা নিত। কাশেম বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়ে শিকার বন্ধ করান। এক সময় দুই বকের ছানা ফেলে রেখে পালিয়ে যায় শিকারিরা; সেসব আহত ছানাকেই কাশেম তুলে এনে সেবা দিয়ে বড় করেন। পরে ছেড়ে দেন। আশ্চর্যজনকভাবে সেই বকগুলোই তাঁর বাড়ির গাছেই বাসা বেঁধেছে, প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকে তাঁর হাতে ধরা ছোট পাত্রের এক মুঠো মাছের।
অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসাকেন্দ্রও যেন হয়ে উঠেছে তাঁর বাড়ি। কোথাও পাখি বা প্রাণী আহত দেখলেই স্থানীয়রা নিয়ে আসেন তাঁর কাছে। কাশেম ওষুধ দিয়ে সুস্থ করেন এবং সুস্থ হলে প্রশান্তির হাসি নিয়ে তাদের উড়িয়ে দেন আকাশে। 
বন বিভাগের চান্দিনা রেঞ্জ অফিসার মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘পাখিপ্রেমী কাশেম ভূঁইয়ার কথা শুনেছি। যদি খাঁচায় আটকে পালন না করেন তাহলে সমস্যা নাই।’

আরও পড়ুন

×