ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

রাজবাড়ি ভাঙার পর প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের খোঁজ

রাজবাড়ি ভাঙার পর প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের খোঁজ
×

রাজশাহী মহানগরীর দরগাপাড়ায় একটি রাজবাড়ি ভাঙার সময় বেরিয়ে আসে সুড়ঙ্গ। বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন দিঘাপতিয়ার রাজা হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ছেলে সন্দীপ কুমার রায় সমকাল

রাজশাহী ব্যুরো

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২১ | আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য যাচাই না করে রাজশাহীর একটি শতবর্ষী রাজবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এতে স্থানীয় সচেতন মহল ও ঐতিহ্য সংরক্ষণবাদীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, হেরিটেজ মূল্য যাচাই না করে রাজবাড়িটি নামমাত্র এক লাখ ৫২ হাজার টাকায় নিলামে বেচা হয়েছে। নিলামের ক্রেতা গত কয়েক দিন ধরে বাড়িটি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন।

গতকাল বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর সিপাইপাড়ায় কেন্দ্রীয় কারাগারের দক্ষিণে বাড়িটি অবস্থিত। এটি রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক দিন ধরে ভাঙার কাজ চলছে। প্রবেশমুখে রাজবাড়ির সমবয়সী নাগলিঙ্গম গাছ রয়েছে, যাতে ফুল ও ফল এসেছে।
বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী, এই সম্পত্তির মালিক ছিলেন দীঘাপতিয়ার রাজা হেমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের ছেলে সন্দীপ কুমার রায়। জনশ্রুতি আছে, পুঠিয়ার মহারানী হেমন্তকুমারী রায়  রাজশাহী আসলে এই দোতলা বাড়িতে থাকতেন।
ভাঙার কাজ চলার সময় রাজবাড়ির মেঝে খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে জলভর্তি সুড়ঙ্গ। জনশ্রুতি আছে, প্রাচীনকালে বাড়ি ঠান্ডা রাখতে বা নিরাপত্তার প্রয়োজনে এমন সুড়ঙ্গ করা হতো।

হেরিটেজ রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাতা মাহবুব সিদ্দিকী মনে করেন, বাড়িটি সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘বাড়িটির বয়স কমপক্ষে ১২০ বছর হবে।  সম্ভবত প্রশাসনের কর্মকর্তারা এলাকাটি পরিদর্শন করেননি। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব না জেনে নিলাম দিয়েছেন। মাহবুব সিদ্দিকী আরও জানান, সুড়ঙ্গ মনে হলেও এটি প্রাচীন নির্মাণশৈলীর অংশ হতে পারে। এটা বাতাস চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে, কলেজ শিক্ষক আকতার বানুর ধারণা, পেছনের দোতলা বাড়ি থেকে সামনের একতলা বাড়িতে যাতায়াতের জন্য এটি নিরাপত্তার কারণে তৈরি করা সুড়ঙ্গ হতে পারে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, রাজপরিবার চলে যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়। পরে ভাষাসংগ্রামী মনোয়ারা রহমান লিজ নিয়ে এখানে কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলেন। তারও আগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম আতাউর রহমান বসবাস করেছেন এই বাড়িতে।

মনোয়ারা রহমান ২০০৯ সালে মারা যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়। সম্প্রতি বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিস ইজারা বাতিল করে বাড়িটি এক লাখ ৫২ হাজার টাকায় নিলামে বেচে দেয়। নিলাম ক্রেতা মতিউর রহমান দুই সপ্তাহ ধরে শ্রমিকদের দিয়ে বাড়িটি ভাঙছিলেন।

সচেতন মহলের দাবিতে ভাঙা বন্ধ
বাড়িটি সংরক্ষণের দাবিতে রাজশাহীর বিভিন্ন সংগঠন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলে অনেক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল, যা ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই রাজবাড়িটিও ভাঙা হলো, যেখানে মহারানী হেমন্ত কুমারী আসতেন। এটি সংরক্ষণ করে পর্যটন কেন্দ্র করা গেলে এই অঞ্চলের জন্য ভালো হতো।’
রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মহিনুল হাসান বলেন, ‘জায়গাটা পরিত্যক্ত ছিল। ভবন ভেঙে পড়ছিল। তাই এটি নিলামে দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্ব জানতে পেরে আমরা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে চিঠি লিখেছি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটাই কার্যকর করা হবে।’

আরও পড়ুন

×