ধর্ষণ ও হত্যায় অপমৃত্যু মামলা নিল পুলিশ!
ছবি: গুগল
বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০১৯ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০১৯ | ০৮:৫২
বড়াইগ্রাম উপজেলার মাদ্রাসাছাত্রী হালিমা খাতুনকে ধর্ষণ ও হত্যা করে লাশ গাছে ঝুলিয়ে রাখার ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা নিয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশের আচরণে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। অভিযোগ উঠেছে, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পুলিশ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করছে।
রোববার গভীর রাতে উপজেলার চান্দাই ইউনিয়নের গাড়ফা মৎসজীবী পাড়ার বাসিন্দা হালিমার লাশ উদ্ধার করা হয়। সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন রাতে গাড়ফা দাখিল মাদরাসা মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। হালিমা ওই মাদরাসায় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। দরিদ্র পরিবারের এই শিশু শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে দাবি করে স্থানীয়রা প্রধান অভিযুক্ত লাদেন দেওয়ান ও তার সহযোগী ছোটন মিয়াকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। ঘটনার পর থেকে সপরিবারে পলাতক রয়েছে অভিযুক্তরা।
সোমবার দুপুরে বড়াইগ্রাম থানায় লাদেন ও ছোটনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দেন হালিমার বাবা হাসেন আলী। তবে লিখিত অভিযোগের কোনো রিসিভ কপি দেয়নি পুলিশ। পরে জানা যায়, ঘটনাটি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসায় যাতায়াতের পথে হালিমাকে উত্যক্ত করতো বখাটে লাদেন দেওয়ান। এ বিষয়ে বারবার গ্রাম প্রধান ও লাদেনের পরিবারের কাছে বিচার দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। সবশেষ গত রোববার সন্ধায় লাদেন হালিমাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণের পর ছোটনের সহায়তায় হত্যা করে বটগাছের সাথে লাশ ঝুলিয়ে রাখে।
হালিমার বাবা হাসেন আলী সোমবার রাতে জানান, তিনি থানায় গেলে এক এসআই অভিযোগটি লিখে নেন। তবে কোনো রিসিভ কপি দেন নি। পরে ঘটনাটি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এতে পুলিশের আচরণ রহস্যজনক মনে হচ্ছে। হালিমার বড় বোন রহিমা খাতুন জানান, গাছ থেকে নামানোর পর হালিমার সালোয়ার রক্তমাখা দেখা যায়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায় তাকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে।
মা মোমেনা বেগম বলেন, হালিমা পড়াশোনায় ভালো ছিল। লাদেন তাকে প্রায়ই উত্যক্ত করলেও মাদরাসা ছাড়েনি সে। মেয়েটির নিরাপত্তার জন্য অনেকবার গ্রামের মুরুব্বীদের বলেছি। তারা কিছুই করতে পারেনি। এ হত্যার বিচার চাই।
হালিমার ফুফাতো ভাই স্থানীয় ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আনতাজুল ইসলাম বলেন, হালিমাকে হত্যার পর ঝুলিয়ে রেখে আত্নহত্যা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ তাকে সেতুর উপর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, যার আলামত রয়েছে। আমরা পুলিশের রহস্যজনক আচরণে অবাক। ময়না তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আমাদের অভিযোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না। এছাড়া অভিযুক্তদের ধরতে এখনও দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই।
প্রতিবেশীরা জানান, হালিমাদের বাড়ি থেকে ত্রিমোহনী বিলের দুরুত্ব প্রায় আধা কিলোমিটার, যেখানে বটগাছে তার মৃতদেহ ঝুলছিল। বিলটি পানিতে ডুবে থাকায় নৌকা ছাড়া সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। যে বটগাছের ডালের সাথে মরদেহটি ঝুলে ছিলো তা মাটি থেকে ৬-৭ ফুট উচুঁ। হালিমা আত্নহত্যা করলে নিচে থেকে কোনোভাবেই গাছের ডালের নাগাল পাওয়া সম্ভব না। ঘটনাস্থল থেকে আরো আধা কিলোমিটার দুরে গিয়ে পরিত্যক্ত একটি সেতুর এককোণে পাটের বস্টত্মা ও রক্তের দাগ পাওয়া যায়।
বড়াইগ্রাম থানার ওসি দিলীপ কুমার দাস মঙ্গলবার বলেন, একজন অভিযোগ দিলেই তো হবে না। ময়না তদন্ত্মের প্রতিবেদন পেলেই ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্নহত্যা প্রমাণিত হবে। প্রতিবেদন পেতে ৮ থেকে ১০ দিন লাগবে। তিনি আরও বলেন, মেয়েদের ক্ষেত্রে রক্ত দেখেই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
বড়াইগ্রাম সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হারুন-অর-রশীদ জানান, ধর্ষণ ও হত্যার আলামত পাওয়া গেলে অপমৃত্যুর মামলা হত্যা মামলায় রুপান্তর হবে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনাটি দেখা হচ্ছে। দায়িত্ব প্রাপ্ত চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বলেন, প্রাথমিকভাবে লাশ দেখে মনে হয়েছে, এটা আত্নহত্যা। তবু ময়না তদন্তের প্রতিবেদন পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।
সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মাহবুবুর রহমান বলেন, হালিমার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি এই চিকিৎসক।
- বিষয় :
- অপমৃত্যু মামলা
- পুলিশ
- বড়াইগ্রাম