রাজশাহীর চারঘাট
লুটপাটে বিধ্বস্ত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এখন মাদকসেবীর আড্ডাস্থল
জাদুঘরের দুর্লভ ছবি পড়ে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
একাত্তরের ১৩ এপ্রিল। ওই দিন সবচেয়ে নির্মম ও পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছিল রাজশাহীর চারঘাটের পদ্মা নদীতীরে। সেদিন দুপুরে আট শতাধিক নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়।
থানাপাড়া, কুঠিপাড়া, মোক্তারপুর, হেদাতিপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ পালিয়ে সারদা পুলিশ একাডেমির কাছে পদ্মা নদীর পাড়ে জমায়েত হয়েছিল। উদ্দেশ্য পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে সীমান্ত ডিঙিয়ে ভারতে যাওয়া। তবে তীরে এসে তারা দেখেন, পারাপারের ব্যবস্থা নেই। ততক্ষণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রামবাসীকে ঘিরে ফেলে।
নদীর পাড়ে উঁচু এক জায়গায় বেশ কয়েকটি মেশিনগান বসিয়ে সব মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। গণহত্যার নিদর্শন না রাখতে নদীতীরে পড়ে থাকা লাশ পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেয় তারা। সেদিন থানাপাড়া ও আশপাশ এলাকা পরিণত হয় পুরুষশূন্য একটি বিধবা গ্রামে। বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির ভেতরে সেই গণকবর বা বধ্যভূমি এখনও আছে।
ইতিহাসের এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি তরুণ প্রজন্মকে জানাতে চারঘাটের শহীদ শিবলী চত্বরের পাশে নির্মাণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর। গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই জাদুঘরে হামলা ও লুটপাট হয়। পরিত্যক্ত জাদুঘরটি এখন মাদকসেবীর আড্ডাস্থল।
উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় জাদুঘরটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এর নির্মাণ খরচ ধরা হয় প্রায় ৬০ লাখ টাকা। নির্মাণ শেষে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জাদুঘরটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জাদুঘর চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, মূল ভবনের দরজা-জানালা, লোহার গ্রিল, লাইট, ফ্যানসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম লুট হয়ে গেছে। পানির পাম্প, বেসিন এমনকি টয়লেটের দরজা পর্যন্ত নেই। জাদুঘরের দুর্লভ বিভিন্ন ছবি পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সেখানে দেখা যায় মাদকসেবীর আনাগোনা। মূল ফটকের সামনে কাঠ স্তূপ করে রাখা।
একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও উপজেলার সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ইয়াসিন আলী বলেন, দীর্ঘদিনের দাবির পর সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা ও গৌরব সংরক্ষণের জন্য জাদুঘরটি নির্মাণ করে। তবে ৫ আগস্টের পর সব সরঞ্জাম ও আসবাব চুরি হয়ে যায়। বর্তমানে জাদুঘরটি পরিত্যক্ত। এক বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাইফুল ইসলাম রায়হান বলেন, জাদুঘরটির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম চারঘাটের মানুষের ত্যাগের কথা জানতে পারত। এটি এখন নেশাগ্রস্তদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। এমন একটি ঐতিসিক স্থাপনা অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাওয়া বেদনাদায়ক।
চারঘাট উপজেলা প্রকৌশলী রতন কুমার ফৌজদার বলেন, নির্মাণ শেষে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের। ৫ আগস্টের পর ভবনটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব সরঞ্জামও লুট হয়েছে। এ অবস্থায় জাদুঘরটি একেবারে উন্মুক্ত। সংস্কারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতির তালিকা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এখনও বরাদ্দ আসেনি।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, জাদুঘরটির সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়ে খুব দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
