চট্টগ্রামে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ঝুলছে তালা
চট্টগ্রাম পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ভাঙচুরের ক্ষত এখনও রয়ে গেছে। সম্প্রতি তোলা সমকাল
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০০ | আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে চট্টগ্রামের ৮১ বীর পুলিশ সদস্য শহীদ হন। এর মধ্যে তৎকালীন পুলিশ সুপার এম শামসুল হকের বিদ্রোহ ও আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। পুলিশ সদস্যদের সেই রক্তিম ইতিহাস এক ছাদের নিচে এনে গড়ে তোলা হয় ‘পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর চট্টগ্রাম’। নগরের দামপাড়ায় মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) লাইন্সের ভেতর জাদুঘরটি অবস্থিত।
জাদুঘরে শহীদ পুলিশ সদস্যদের নাম, পরিচয়, ছবি, ব্যবহৃত অস্ত্র, পোশাক, শহীদ পুলিশ সুপার এম শামসুল হকের স্মারক র্যাঙ্ক ব্যাজ, টিউনিক সেট থেকে শুরু করে স্টিক, ক্যামেরা, কলম, বেল্ট ও ক্যাপ স্থান পেয়েছে। আরেক বীর শহীদ আরআই আকরাম হোসেনের স্মারক ব্যবহৃত রেডিও সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৭১ সালে পুলিশের যুদ্ধস্মৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয় ২০২৪ সালের ২ আগস্ট। তারপর থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৭ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। তালা ঝুলছে জাদুঘরের দরজায়।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সামনে ১৭ মাস আগে ভাঙচুর হওয়া দৃষ্টিনন্দন মনোগ্রাম ও সাইনবোর্ডটি আর লাগানো হয়নি। টিকিট কাউন্টার বন্ধ। ভাঙচুরের শিকার ‘টিকিট কাউন্টার’ লেখা সাইনবোর্ডটি এখনও ভাঙা অবস্থা ঝুলে আছে। জাদুঘরের সামনে আগাছা ও জঙ্গল পরিষ্কার করছেন ফিরোজ নামে এক মালী। তিনি বলেন, আমি এখানে দেড় বছর পর এসেছি। স্যারেরা জাদুঘরের সামনে জন্ম নেওয়া আগাছা পরিষ্কার, ফুল ও সৌন্দর্যবধন গাছগুলোকে কাটিং করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছি।
জাদুঘরের সামনে সিএমপির গেটে দায়িত্বরত পুলিশের নায়েক মো. আলম বলেন, জাদুঘরটির সামনের গেটে প্রায় বছরখানেক ডিউটি করছি। যেদিন থেকে এখানে ডিউটি করতে এসেছি, সেই দিন থেকেই এটি খুলতে দেখিনি। জাদুঘরের ভেতর কী আছে, তাও জানি না।
জাদুঘরের পাশে সুপারশপ ‘এস্টোরিযন’-এর প্রহরী মো. ইবনুর বলেন, সামনের রমজান এলে এক বছর হবে এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছি। কিন্তু এক দিনের জন্যও জাদুঘরের টিকিট কাউন্টার কিংবা জাদুঘর খুলতে দেখিনি।
জাদুঘরটি ১৬ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিল্প-স্থাপত্যের ক্রিয়ামূলক ও মিনিমালিজমের সংমিশ্রণে ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীকে প্রাধান্য দিয়ে দুটি লাল ভবনের অখণ্ডতা বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালের ২৬ মার্চ দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
জাদুঘরটি খোলা থাকা অবস্থায় মানুষ সহজেই জানতে পারতেন মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর বীরত্বের ইতিহাস। জাদুঘরের দেয়ালে চট্টগ্রামে জীবন উৎসর্গ করা ৮১ সদস্যের নাম ও তার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন স্মারক, ডকুমেন্ট, যুদ্ধের অস্ত্রও স্থান পেয়েছে। জাদুঘরের পরতে পরতে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন সময়ের পুলিশের পোশাক, তৎকালীন সরকারি দপ্তরের চিঠি, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ কাটিং, বীরশ্রেষ্ঠদের ইতিবৃত্তান্ত, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ সদস্যদের ছবি, বর্তমান পুলিশ সদস্যদের পোশাক, দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের ম্যাপ, ফাঁসির মঞ্চ, ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লেসহ হল রুম, বঙ্গবন্ধু কর্নার ও তাঁর লেখা বই, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন বই, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রসহ বহু দুর্লভ সংগ্রহশালা।
এ ছাড়া ব্রিটিশ আমলের বিদ্রোহের অন্যতম পুরোদা মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে গঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির সদস্যদের ছবি, ব্যবহৃত অস্ত্র, পোশাক ও বিভিন্ন জিনিসপত্র দর্শনার্থীদের জন্য উপস্থাপন করা রয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ দামপাড়া পুলিশ লাইন্স আক্রমণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সম্মুখযুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।
প্রবীণ মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন জেলা পুলিশ সুপার এম শামসুল হক, দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের রেঞ্জ ইন্সপেক্টর আকরাম হোসেন, কোতোয়ালি থানার ওসি আব্দুল খালেকসহ অনেকে। তাদের বীরত্বকে প্রাধান্য দিয়েই পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দুঃখজনক। পুলিশ বাহিনীকে তাদের বীরত্বের ইতিহাস সাধারণ মানুষকে জানতে, দেখতে ও চর্চা করার সুযোগ দিতে হবে। তবেই পুলিশের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আরও বাড়বে। সর্বোপরি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারবে নতুন প্রজন্ম।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে পুলিশের আত্মত্যাগ একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। জাদুঘরে সেই ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এটি বন্ধ থাকা ঠিক হচ্ছে না। দ্রুত উন্মুক্ত করা উচিত।
সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি-সদর) অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, আমাদের বহুমুখী কাজ করতে গিয়ে জাদুঘরের দিয়ে ভালোভাবে মনোযোগ দিতে পারিনি। কিছু গ্লাস, সাইনবোর্ড ভেঙে ছিল। তার সংস্কার চলছে। এ মাসের মধ্যেই জাদুঘরটি আগের মতো চালু করা হবে।
- বিষয় :
- মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
