ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিএনপি নেতার ঘরে তালা দিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন

আগুনে দাঁড়িয়ে আয়েশার আকুতি ‘আব্বু বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’

ঘুমন্ত মেয়ের মৃত্যু, দগ্ধ নেতা ও আরও দুই কন্যা

আগুনে দাঁড়িয়ে আয়েশার আকুতি ‘আব্বু বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’
×

আয়েশা বেগম বিনতি

 লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের ঘরে শুক্রবার গভীর রাতে তালা দিয়ে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর সাত বছরের মেয়ে আয়েশা বেগম বিনতির মৃত্যু হয়েছে। আগুনে দগ্ধ হয়েছেন বেলাল হোসেন এবং তাঁর দুই মেয়ে সালমা আক্তার ও বীথি  আক্তার। বেলাল লক্ষ্মীপুর সদরের ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক।

স্থানীয়রা জানান, বেলাল রাতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ২টার দিকে দুর্বৃত্তরা ঘরের বাইরে থেকে দরজায় তালা ঝুলিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। শিশু আয়েশা ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়। গুরুতর দগ্ধ বেলাল ও তাঁর দুই মেয়েকে উদ্ধার করে প্রথমে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে দুই মেয়েকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। বড় মেয়ে সালমা আক্তারের শরীর প্রায় পুরোটাই দগ্ধ হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ওসি মো. ওয়াহিদ পারভেজ জানান, এটি পরিকল্পিত ঘটনা কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে মামলা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এখনও মামলা হয়নি। অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। 

বেলালের স্ত্রী নাজমা আক্তার বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা আমাদের পুরো পরিবারকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়েছে। আমার আয়েশাকে কেড়ে নিয়েছে।’
মেয়েকে হারানোর যন্ত্রণায় নাজমা কখনও হাসপাতালের করিডোরে বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন, আবার কখনও বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, আগুন আর ধোঁয়ার তীব্রতায় ঘুম ভেঙে যায় আমার। রাত দুইটা বাজে তখন। ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। সেই আগুনে পুড়ছিল আমার বুকের ধন আয়েশা আক্তার। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আয়েশা চিৎকার করছিল, ‘আব্বু, আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও।’ চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখলেও কোনোভাবেই আয়েশার কাছে যেতে পারিনি।  

নাজমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি শুধু শেষবারের মতো আয়েশার মুখটা দেখতে চাই। মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।’ 

বেলালের বড় ভাইয়ের মেয়ে সুমি আক্তার বলেন, আয়েশা স্থানীয় ফাইভ স্টার স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। শনিবার দুপুরে নিজ বাড়িতেই তার জানাজা শেষে দাফন করা হয়। আগুনে ঘরে থাকা টাকা, মোটরসাইকেল এবং ব্যবসার মালপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। কাকার তেমন শত্রু নেই, রাজনীতি করার কারণে শত্রুতা করে পুরো পরিবারকে হত্যা করতে চেয়েছিল দুর্বৃত্তরা। 

সদর হাসপাতালের বেডে শুয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমি এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুর্বৃত্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সঠিক তদন্ত চাই। আমার নিষ্পাপ মেয়েকে যারা হত্যা করেছে, আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে এখনও ঢাকায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আমার পুরো পরিবারকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই আগুন দেওয়া হয়েছে।’

বেলাল আরও বলেন, ‘আমি সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে দীর্ঘদিন সততার সঙ্গে চলছি। কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। তবে আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত– এ কারণেই প্রতিপক্ষ কোনো মহল এই নৃশংস কাজটি করতে পারে।  

ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আজাদ হোসেন বলেন, ‘রাতের আঁধারে পরিকল্পিতভাবে বেলালের ঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরানো হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’

এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী। এক বিবৃতিতে তিনি দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। 

লক্ষ্মীপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রণজিত কুমার দাস জানান, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। অগ্নিদগ্ধ দুজনের অবস্থা গুরুতর।


 

আরও পড়ুন

×