সরগরম দেবীগঞ্জের তিন বালুমহাল
দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবীগঞ্জ বালু মহালে করতোয়া নদী থেকে বালু তুলছেন কয়েকজন শ্রমিক সমকাল
দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদীর বালু এখন দেশের নির্মাণ শিল্পের এক আস্থার নাম। উচ্চ গুণমান ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এই বালু এখন ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী শাহরিয়ার ইসলাম শাকিল বলেন, এই বালু অত্যন্ত উন্নতমানের। এটি ‘ডোমার স্যান্ড’ নামে পরিচিত। এর ফাইননেস মডুলাস সাধারণত ২.২০ থেকে ২.৫০-এর মধ্যে। কংক্রিট, ব্লক ও বড় বড় দালান নির্মাণের জন্য এটি সেরা। জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ে এই বালুকে জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে চিঠি পাঠিয়েছেন।
উপজেলার করতোয়া নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা দেবীডুবা, দেবীগঞ্জ এবং তেলিপাড়া; এই তিনটি বালুমহাল এখন কর্মতৎপরতায় মুখর। সরেজমিন দেবীগঞ্জ বালুমহালে গিয়ে দেখা যায় বিশাল কর্মযজ্ঞ। ভোর না হতেই নদীপাড়ে শুরু হয়েছে শ্রমিকদের আনাগোনা। হাড়কাঁপানো শীত বা তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে শত শত শ্রমিক নেমে পড়েন কোমরপানিতে; হাতে বাঁশের টুকরি। নদী থেকে বালু তুলে সেই টুকরি ভরে জমা করেন নৌকায়। বালুভর্তি নৌকাগুলো যখন নদীর চরে এসে ভেড়ে, তখন শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের কাজ।
নদীর চরে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকে ট্রাক্টর। নৌকার বালু চলে যায় ট্রাক্টরে। এরপর সেই বালু বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ডাম্পিং ইয়ার্ডে। সেখানে অপেক্ষমাণ বড় বড় ট্রাক। শ্রমিকদের কেউ বালু মাপছেন, কেউবা ট্রাকে বালু লোড করছেন। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো এলাকা যেন এক বিশাল কর্মশালায় পরিণত হয়। শ্রমিকদের হাঁকডাক, ট্রাক্টরের শব্দ আর বালু লোড-আনলোডের নিরন্তর ব্যস্ততায় পুরো এলাকা থাকে প্রাণচঞ্চল।
এই কর্মব্যস্ততার হাত ধরেই দেবীগঞ্জের করতোয়ার বালু পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়ার মতো দেশের বড় বড় শহরের মেগা প্রজেক্টে। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ট্রাক বালু পাঠানো হয়। দেড় শতাধিক নৌকায় প্রায় ৬০০ শ্রমিক কাজ করেন। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নদী থেকে বালু তোলা, ট্রাক্টরে ভরা এবং ট্রাকে লোড করার কাজে সহস্রাধিক শ্রমিক সরাসরি জড়িত। একজন শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। বালুমহাল ও ডাম্পিং ইয়ার্ডগুলোকে কেন্দ্র করে পাকুরীতলা বা ব্রিজপাড়ের মতো এলাকায় নতুন নতুন বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
কথা হয় দেবীডুবা বালুমহালের শ্রমিক আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ট্রাক্টরপ্রতি তারা পান ৪০০ টাকা। প্রতিদিন ১০-১২ ট্রাক্টর বালু তোলা হয়। দিন শেষে যা পাওয়া যায় সমানভাগে ভাগ করে নেন তারা।
এই মহালের ইজারাদার আবুল বাশার বলেন, বালু উত্তোলন, পরিবহন ও শ্রমিকদের মজুরি মিলিয়ে প্রতিদিন এখানে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বিশাল বাণিজ্য চলে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) উপজেলার সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিব মুন বলেন, পরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা গেলে এটি জেলার অর্থনীতির চেহারা বদলে দেবে। তবে নদী রক্ষা করে বালু উত্তোলনের ওপর জোর দিতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, এখানকার বালু স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। করতোয়া নদীর এ বালুর জিআই স্বীকৃতির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছি। এ ছাড়া এই বালু ব্যবহার করে কোনো শিল্প-কারখানা স্থাপন করা যায় কিনা, তা নিয়ে গবেষণার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
- বিষয় :
- বালুখেকো
