ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

প্রকাশ্যে হত্যার শিকার তরুণের দাফন সম্পন্ন

বখাটেপনায় জিম্মি সিরাজগঞ্জ, দুর্বল নিরাপত্তায় বাড়ছে শঙ্কা

প্রতিদিনই মারামারি হচ্ছে কোনো না কোনো মহল্লায়

বখাটেপনায় জিম্মি সিরাজগঞ্জ, দুর্বল নিরাপত্তায় বাড়ছে শঙ্কা
×

রিয়াদ হত্যায় জড়িতদের বিচার দাবিতে শহরে গতকাল শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন সমকাল

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজগঞ্জের নানা মহল্লায় কয়েক মাস ধরে বখাটেদের উৎপাত বেড়েছে। এদের বেশির ভাগই কিশোর-তরুণ বয়সী। তারা স্কুল-কলেজফেরত কিশোরী-তরুণীদের উত্ত্যক্ত করার জেরে জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষে। গত তিন মাসে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মহল্লায় মারামারি হয়েছে। এমনই এক বিরোধের জেরে রোববার বিকেলে শহরের ব্যস্ততম চৌরাস্তা মোড়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় আব্দুর রহমান রিয়াদ (১৮) নামের এক তরুণকে। ঘটনাস্থলের মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মিটারের মধ্যেই শহরের ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ি। এ হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে শহরের জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সামনে এসেছে। 

বড়পুলে আড্ডাবাজি
শহরের কাটাখালী খালের ওপর অবস্থিত ইলিয়ট ব্রিজটি বড়পুল হিসেবে পরিচিত। এই সেতুর আশপাশে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মুজিব সড়কের পশ্চিম পাশে সবুজকানন হাইস্কুল, একই সড়কের সামান্য এগিয়ে পূর্ব পাশে ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল। এ ছাড়া সেতুর দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় জেনারেল হাসপাতালের পাশে সালেহা ইসহাক সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান। সেতুর উত্তর-পূর্বের সড়কটি ইসলামিয়া সড়ক ধরে ধানবান্ধি মহল্লার সড়কে মিশেছে। আর পশ্চিম পাশে ২ নম্বর খলিফাপট্টি। 
এলাকাবাসী জানায়, বড়পুল ঘিরে আশপাশের কয়েকটি এলাকার বখাটে কিশোর-তরুণরা আড্ডা জমায়। তারা সকালে বিদ্যালয়গামী ও বিকেলে বাড়িফেরত কিশোরী-তরুণীদের প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া থেকে শুরু করে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। এসব নিয়ে ধানবান্ধি, ভাঙ্গাবাড়ী, সরদারপাড়া, গয়লা, একডালা, হোসেনপুর, পুঠিয়া, মালশাপাড়া, সয়াধানগড়ার নানা গ্রুপের মধ্যে তিন মাসে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। 
পুরোনো এমনই এক বিরোধের জেরে রোববার হত্যার শিকার হন ইসলামিয়া সরকারি কলেজের বাণিজ্য প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান রিয়াদ। তাঁর বাসা সয়াধানগড়া খানপাড়ায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সেদিন বিকেলে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসে ছিলেন রিয়াদ। এ সময় ২৫ থেকে ৩০ সশস্ত্র কিশোর-তরুণ তাঁকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে ফেলে যায়। সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সন্ধ্যা ৭টার পর মারা যান রিয়াদ। 

ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সোমবার বিকেলে রিয়াদের লাশ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। মাগরিবের নামাজের পর সয়াধানগড়া দারুল ইসলামী একাডেমি প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে রহমতগঞ্জ কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন হয়। 
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, রিয়াদের ওপর হামলাকারীদের আনুমানিক বয়স ১৬ থেকে ১৮। তারা স্থানীয় বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী। এদের কেউ ধানবান্ধির, কেউ আমলাপাড়ার, কেউ আবার হোসেনপুরের বাসিন্দা। 

সয়াধানগড়া খানপাড়ার বাড়িতে গতকাল কথা হয় রিয়াদের বাবা রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কখনও মারামারি বা কোনো পক্ষের রাজনীতিতে ছিল না। ভাঙ্গাবাড়ীতে তাঁর বন্ধু থাকতে পারে, কিন্তু সে তো কোনো ঝামেলায় যায়নি। ভাঙ্গাবাড়ীর সঙ্গে ধানবান্ধির গন্ডগোলের জেরে তাহলে কেন তাকে খুন করা হলো? প্রশাসনের কাছে আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
প্রতিবেশী কলেজশিক্ষক বরাত খান ও ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান বলেন, তিন মাস ধরে শহরের ধানবান্ধি-আমলাপাড়া, সরদারপাড়া-ভাঙ্গাবাড়ী, সরদারপাড়া, হোসেনপুর-মালশাপাড়াসহ বিভিন্ন মহল্লায় মারামারি চলছে। এটি এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শহরজুড়েই নৈরাজ্য ও অরাজকতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কেউ আর এখন নিরাপদ নয়।
এদিন বিকেলে রিয়াদ হত্যায় জড়িতদের বিচার দাবিতে শহরের বাজার মুক্তির সোপান ও স্টেশন স্বাধীনতা স্কয়ারে বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়েছে। এতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে নানা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। তারা দায়ীদের ফাঁসির দাবি তোলেন। 

আগেই উত্তপ্ত ছিল পরিস্থিতি
বখাটেপনার জেরে ভাঙ্গাবাড়ী ও ধানবান্ধি মহল্লার উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই তারা একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়েছে। বেশ কয়েকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও হয়েছে। এসব ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। 
ইলিয়ট ব্রিজ এলাকার বাসিন্দা ও জেনিন কাউন্টার বাসের সুপারভাইজার সেলিম আহমেদ বলেন, ‘ব্রিজের ওপর দিয়ে স্কুল ও কলেজপড়ুয়া মেয়েরা আসা-যাওয়া করে। পথে উঠতি বয়সের বখাটেরা তাদের বিরক্ত করে। এসব নিয়ে প্রায়ই ব্রিজের ওপরে দুই গ্রুপের মধ্যে গন্ডগোল লেগেই আছে। এসব নতুন নয়, অনেকদিন থেকেই হচ্ছে। পুলিশকেও বলেছি।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কথা হয় ভাঙ্গাবাড়ী মহল্লার বাসিন্দা ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জেলা সভাপতি জুনায়েদ সবুজের সঙ্গে। তিনি অনেক লোকজনের মধ্যে দরবারে আছেন জানিয়ে বলেন, ‘পরে এই প্রসঙ্গে কথা বলব।’

ধানবান্ধি মহল্লায় বাসা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন ছানুর। তাঁর ভাষ্য, ‘যতদূর শুনেছি রিয়াদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পেছনে কলেজের কোনো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুই গ্রুপে দ্বন্দ্ব ছিল। ভাঙ্গাবাড়ীর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুধু ধানবান্ধির ছেলেরা নয়, আশপাশের হোসেনপুর ও আমলাপাড়ারার ছেলেরাও জড়িত থাকতে পারে। এর আগেও ইলিয়ট ব্রিজে গন্ডগোল হয়েছিল। দশ বাপের দশ ছেলেকে কন্ট্রোল করা কঠিন।’
চৌরাস্তা মোড়ের ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক তাজমিলুর রহমান বলেন, তিন মাস ধরেই শহরের মহল্লায় মহল্লায় গন্ডগোল চলছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে চলে আসার পর আবারও গন্ডগোল বাড়ছে। এসব নিয়ে পুলিশ এমনিতেই ঝামেলায় রয়েছে। তার ওপর কলেজ শিক্ষার্থী রিয়াদের মৃত্যুর ঘটনায় তারা বিব্রত। 
সদর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় রিয়াদের বাবা রেজাউল করিম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এতে ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। দুই মহল্লার বিরোধ মেটাতে তারা রোববার বিকেল থেকেই মাঠে আছেন। 

ওসি আরও বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই 
মারামারি হচ্ছে কোনো না কোনো মহল্লায়। |সোমবার সন্ধ্যার পরও নয়নমোড় এলাকায় ভাঙ্গাবাড়ী ও সরদারপাড়ার মধ্যে মারামারি হয়েছে। আমি ঘটনাস্থলেই আছি।’ তবে থানায় নতুন যোগদান করায় তিন মাসে ঠিক কয়টি ঘটনায় মামলা হয়েছে– এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেননি তিনি। 
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, রিয়াদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িত অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। 

আরও পড়ুন

×