ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়িয়ে দেয় ঘটনাটি

রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়িয়ে দেয় ঘটনাটি
×

ভালুকায় সড়ক বিভাজকে থাকা গাছে ঝুলিয়ে পোড়ানো হয় দিপু চন্দ্র দাসের লাশ ফাইল ফটো

তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ময়মনসিংহের ভালুকায় ‘পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড’ কারখানার জুনিয়র কোয়ালিটি কন্ট্রোলার দিপু চন্দ্র দাসকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এই ঘটনা ঘটে। যার ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি গোটা রাষ্ট্রের বিবেকবান মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
ময়মনসিংহের তারাকান্দার বাসিন্দা রবিচন্দ্র দাসের ছেলে দিপু চন্দ্র দাস (২৮) ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও একমাত্র উপার্জনক্ষম। গত দুই বছর ধরে ভালুকার জামিরদিয়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস কারখানায় কোয়ালিটি কন্ট্রোল সেকশনে চাকরি করছিলেন তিনি।

দিপুর সহকর্মী শ্রমিক হ্যাপি আক্তার, রহিমা খাতুন, কুলসুম ও সেলিম মিয়া জানান, কাজ করার সময় তাদের সঙ্গে ধর্মীয় কিছু রীতিনীতি নিয়ে খুনসুটি করছিলেন দিপু চন্দ্র দাস। এটিকে পুঁজি করে কারখানার ভেতরের কয়েকজন শ্রমিক রটিয়ে দেয় ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন দিপু। মুহূর্তের মধ্যে এই গুজব পাশের শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
গত ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গুজবের ডালপালা বিস্তৃত হয়। লাঠিসোটা নিয়ে কারখানার ফটকে জড়ো হতে থাকে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’। তারা কারখানার ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় দিপু বারবার আকুতি জানিয়ে বলেন, তিনি নির্দোষ। কিন্তু তাঁর কান্না শোনার মতো কেউ ছিল না।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উত্তেজিত জনতা দিপুকে টেনেহিঁচড়ে কারখানার বাইরে বের করে নিয়ে যায়। রাস্তা দিয়ে দিপুকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে শুরু হয় নির্যাতন। এক পর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন দিপু। পুলিশ ও সেনাবাহিনী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও জনতার আক্রমণের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

মৃত্যুর পর দিপুর নিথর দেহ টেনেহিঁচড়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নিয়ে যায়। সেখানে সড়ক বিভাজকে থাকা একটি গাছে তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এর পর কেরোসিন ও পেট্রোল ঢেলে লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

র‍্যাব-১৪ এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দিপুর বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ম অবমাননার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাননি তারা। কারখানার ভেতর থেকে পরিকল্পিতভাবে স্লোগান দিয়ে বহিরাগতদের উসকে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

তারাকান্দার মোকামিয়াকান্দা গ্রামে দিপুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দিপুর বাবা রবিচন্দ্র দাস বিলাপ করে বলছেন, তাঁর ছেলে শিক্ষিত ছিলেন। দিপু কোনো ধর্মকে ছোট করতে পারেন না। যদি অপরাধ করেও থাকেন, তবে কি দেশে আইন ছিল না? কেন তাঁকে পুড়িয়ে মারা হলো?
নিহত যুবকের স্ত্রী মেঘনা রানী বলেন, ‘আমার স্বামীই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। পরিবারের খরচ চালানোর মতো এখন আর কেউ নাই। আমার সন্তানকে কীভাবে মানুষ করব?’
এই ঘটনায় ভালুকা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন নিহত দিপুর ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০-১৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ভিডিও এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এ পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও র‍্যাব।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ভিডিও দেখে বাকিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। রিমান্ডে আসামিরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
ঘটনার পর দিপুর বাড়িতে যান অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। তিনি বলেন, দিপু হত্যাকাণ্ড একটি নৃশংস অপরাধ। রাষ্ট্র এই পরিবারের আর্থিক ও আইনি সব দায়িত্ব নেবে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই মানুষ এমন নৃশংস হতে সাহস পায়। আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল দিপুর বাড়িতে গিয়ে প্রশাসনের গাফিলতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন।

পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার (এডমিন অ্যান্ড কমপ্লাইন্স) উদয় হোসাইনের ভাষ্য, তাদের পক্ষ থেকে দিপু দাসকে রক্ষায় চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। বিক্ষুব্ধ জনতা মব সৃষ্টি করে ফটক ভেঙে তাঁকে নিয়ে যায়। যথাসময়ে শিল্প পুলিশকে ঘটনা জানিয়েছিলেন তারা।
কারখানাটি স্থানীয়ভাবে দেখভাল করেন ভালুকা পৌর বিএনপির আহ্বায়ক হাতেম খান। সমকালকে তিনি বলেন, তাদের কোম্পানিতে সাড়ে আট হাজার সনাতন ধর্মের লোক কর্মরত। দিপু দাসকে হত্যায় জড়িতদের বিচারের দাবি তাঁর। দিপুর পরিবারকে এককালীন নগদ অর্থসহ সন্তানের সারাজীবনের ভরণপোষণের জন্য প্রতি মাসে টাকা দেওয়া হবে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।

আরও পড়ুন

×