ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যন্ত্রের দখলে দরিদ্রদের কর্মসংস্থান প্রকল্প

যন্ত্রের দখলে দরিদ্রদের কর্মসংস্থান প্রকল্প
×

শ্রমিকের পরিবর্তে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু নেওয়া হচ্ছে কাবিটা প্রকল্পের রাস্তায়। ছবিটি গত সোমবার জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের বরুল এলাকা থেকে তোলা সমকাল

আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রামের দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছর গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় টিআর, কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমনির্ভর উন্নয়ন। অর্থাৎ যন্ত্র নয়, মানুষের হাতেই হবে মাটি কাটার কাজ, রাস্তা মেরামত ও অবকাঠামো সংস্কার। তবে জামালপুর জেলায় এসব নীতিমালা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
জামালপুরের একাধিক উপজেলায় টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) ও কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্পে নিষিদ্ধ ড্রেজার, ভেকু, ট্রাক্টর ও ভটভটি ব্যবহার করে মাটি ও বালু উত্তোলনের মাধ্যমে কাজ দেখানো হচ্ছে। সেই কাজের বিপরীতে তৈরি করা হচ্ছে ভুয়া শ্রমিক হাজিরা ও মাস্টাররোল। এর মাধ্যমে বিল বানিয়ে সরকারি বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে জামালপুর সদরসহ ৭ উপজেলায় টিআর খাতে ১১ কোটি ৭৫ লাখ ৫১ হাজার টাকার বিপরীতে ৬১১টি, কাবিটা ও কাবিখা খাতে ১১ কোটি ২৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, ৬৭২ টন চাল ও সমপরিমাণ গমের বিপরীতে ৫১৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কাজ সম্পন্ন না হতেই প্রথম পর্যায়ের এসব প্রকল্প বাস্তাবায়নের সময়সীমা ৩০ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। অবশ্য এ বছর মাটির চেয়ে পাকাকরণ কাজের পরিমাণই বেশি বলে জানিয়েছে পিআইও অফিস।

গত সোমবার ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, জসিমের বাড়ি থেকে ওয়াহেদ ডাক্তারের বাড়ি হয়ে নদীঘাট পর্যন্ত রাস্তায় বালু ফেলা হচ্ছে অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে। কাবিটা প্রকল্পের আওতায় এ কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির সভাপতি ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য নাসিমা। তিনি ও তাঁর স্বামী জহুরুল ইসলাম জানান, বরাদ্দের টাকায় শ্রমিক পাওয়া যায় না। তা ছাড়া প্রকল্প এলাকায় প্রয়োজনীয় মাটিও নেই। বাধ্য হয়েই ড্রেজার ব্যবহার করতে হচ্ছে। একই ইউনিয়নের দক্ষিণ বরুল এলাকায় মফিজের বাড়ি থেকে জাহাঙ্গীরের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার মাটি কাটার জন্য কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৬ টন গম বরাদ্দ হয়। এই প্রকল্পেও বালু ফেলা হচ্ছে ড্রেজারের মাধ্যমে। প্রকল্পের সভাপতি বেলগাছা ইউপি সদস্য আবু বক্কর মণ্ডলের ভাষ্য প্রায় একই। তবে স্থানীয় শ্রমিকদের আক্ষেপ, এসব প্রকল্পে তাদেরই মাটি কাটার কথা ছিল। কিন্তু ড্রেজার দিয়ে রাস্তায় বালু ফেলার কারণে শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। ফলে তারা কর্মহীনই রয়ে গেলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ– টিআর, কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্পের সভাপতিদের সঙ্গে অবৈধ ড্রেজার ও ভেকু মালিকদের যোগসাজশে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শ্রমিকের পরিবর্তে ড্রেজার ও ভেকু মালিকদের চুক্তিতে কাজ দেওয়া হচ্ছে। পরে ভুয়া শ্রমিক হাজিরা ও মাস্টার রোল তৈরি করে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়। সেই টাকা প্রকল্প কমিটির লোকজন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের তদারকি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভাগভাটোয়ারা করে নেন। এর ফলে সরকারি টাকা অপচয় ছাড়াও প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে। কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দরিদ্র শ্রমিকরা।
সরেজমিন পরিদর্শনের সময় কোনো প্রকল্পে কাজের বিবরণ সংবলিত সাইন বোর্ড দেখা যায়নি। যদিও নীতিমালায় প্রকল্পের শুরুতেই সাইনবোর্ড থাকার বিধান রয়েছে। এলাকার সচেতন মানুষের ক্ষোভ, ইউনিয়নের এক শ্রেণির জনপ্রতিনিধি গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ কেড়ে নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে গ্রামীণ অব কাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির প্রকল্পকে লুটপাটের প্রকল্পে পরিণত করেছেন। তাদের ভাষ্য, এই টাকা গরিব মানুষের প্রাপ্য। অবৈধ ড্রেজার দিয়ে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে সরকারি টাকা নিজেদের পকেটে ভরছেন কিছু লোক।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিমের ভাষ্য, এসব প্রকল্পের অনিয়ম সরকারি নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্প নীতিমালা শ্রমনির্ভর কাজ বাধ্যতামূলক। যন্ত্র ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, প্রকৃত শ্রমিক ছাড়া বিল উত্তোলনও বেআইনি। তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রাম ও চরাঞ্চলের বহু মানুষ কর্মহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাবন করছেন। এসব হত-দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষকে কর্মক্ষম করে তুলতে সরকার প্রতি বছর এসব প্রকল্প দিয়ে থাকেন। কিন্তু সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা (পিআইও) কর্মচারীর যোগসাজশে শ্রমিকের পরিবর্তে অবৈধ ড্রেজার কিংবা ভেকু দিয়ে নামমাত্র মাটি কেটে ভুয়া শ্রমিক হাজিরা ও মাস্টার রোল দিয়ে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করছেন। এতে লাভবান হচ্ছে প্রকল্প কমিটিতে থাকা লোকজন ও প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে।
ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নূর-এ শেফা বলেন, এই উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে ড্রেজার ব্যবহার হয়ে আসছে। এসব কথা ভেবেই এবার মাটির কাজ কমিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিনের এই চর্চা রাতারাতি বদলনো সম্ভব নয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আস্তে আস্তে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে বলেও অভিমত তাঁর। 

বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাবীবুর রহমান সুমন জানান, তাঁর উপজেলাতেও পাকা ও সিসিকরণের প্রকল্পই বেশি। তাঁর ভাষ্য, মাটির কাজের যে বরাদ্দ থাকে তা দিয়ে শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাছাড়া মাটির কাজের চেয়ে পাকাকরণ কাজের স্থায়িত্ব বেশি। তাই তিনিও এবার মাটি কাটার প্রকল্প কমিয়ে দিয়ে পাকাকরণ কাজ বেশি দিয়েছেন।
জামালপুর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন, কোনো কোনো প্রকল্প এলাকায় মাটি না পাওয়ায় দূর থেকে ট্রাক্টরে মাটি আনতে হয়। এতে খরচের পরিমাণও বেড়ে যায়। তাঁর দাবি, সদর উপজেলায় তাঁর সার্বিক তদারকিতেই প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে। যে কটি মাটির কাজের প্রকল্প রয়েছে তার কাজ শ্রমিক দিয়েই করানো হচ্ছে। 
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহেল কাফির ভাষ্য, গ্রামীণ অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় চলমান প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ প্রায় শেষ। এ অবস্থায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার কারণে সরকারি নির্দেশনায় প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা পেলে সরকারি নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ করা হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন

×