৯ প্রার্থীর মধ্যে ছয়জনেরই তৎপরতা ও পরিচিতি কম
মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯ জন। তাদের মধ্যে ছয় প্রার্থীকেই সাটুরিয়ার ভোটাররা খুব একটা চেনেন না। এসব প্রার্থীকে এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখাও যায়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন উপলক্ষেও তাদের পক্ষে কাউকে ভোট চাইতে মাঠে ময়দানে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। এমনকি, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা থেকে গতকাল বুধবার প্রতীক বরাদ্দের পরও এই প্রার্থীরা সাটুরিয়া আসেননি।
এ আসন থেকে ১২ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ৯ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন। পরে তিনজন আপিল করলে প্রার্থিতা ফিরে পান। ফলে এ আসনে ১২ জন প্রার্থীকেই বৈধ ঘোষণা করা হয়। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে গত মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ দেলওয়ার হোসাইনসহ তিনজন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। ফলে এ আসনে প্রার্থী আছেন ৯ জন। গতকাল বুধবার তাদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়। প্রার্থীরা হলেন– বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা (ধানের শীষ), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাইদনুর (রিকশা), বাংলাদেশ জাসদের মো. শাহজাহান আলী (মোটরগাড়ি), জাতীয় পার্টি-জেপির মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ (বাইসাইকেল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সামসুদ্দিন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির (এরশাদ) আবুল বাশার বাদশা (লাঙ্গল) এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আতাউর রহমান আতা (ফুটবল) ছাড়াও স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মফিজুল ইসলাম খান কামাল (সূর্যমুখী ফুল) ও রফিকুল ইসলাম খান (মোটরসাইকেল)।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা, দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী আতাউর রহমান আতা ও বাংলাদেশ জাসদের শাহজাহান আলীর এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এ ছাড়া ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীকে আসন ছেড়ে দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ দেলওয়ার হোসাইনেরও এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বাকিদের নির্বাচনী এলাকায় পরিচিতি তুলনামূলক কম। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম বা নির্বাচনী প্রচারও তেমন একটা নেই। গত কয়েকদিনে সংসদীয় আসনের সাটুরিয়ার বিভিন্ন এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জাতীয় পার্টি-জেপির প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ হলফনামায় তাঁর ঠিকানা দেখিয়েছেন ঢাকার মিরপুরের মনিপুর। তাঁর মূল বাড়ি সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নে। এলাকায় তাঁর পরিচিতি খুব একটা নেই। এমনকি, তাঁর নিজ ইউনিয়নের মানুষও তাঁকে বেশি চেনেন না। বরাইদ ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস খান মজলিশ মাখন জানান, মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ আমাদের বংশের মানুষ। তিনি ১৯৭০ সালে জিনাত মজলিশ পরিষদের ছাত্রলীগ করতেন। এরপর আ স ম আব্দুর রবের জাসদ করতেন। তিনি সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করেছিলেন, আওয়ামী লীগ সময়ের নির্বাচনে তিনি এমপি ও রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করেন, ঢাকা সিটির মেয়র নির্বাচনে অংশ নেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সামসুদ্দিন তাঁর ঠিকানা দেখিয়েছেন মানিকগঞ্জ পৌরসভার সিদ্দিকনগরের পূর্ব দাশরা। সাটুরিয়ার একাধিক ইউনিয়নের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, এই প্রার্থীর নাম তারা শুনেননি। নির্বাচনের তপশিল হওয়ার পরও তাঁকে এলাকায় দেখা যায়নি। এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
সাটুরিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীর কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সাটুরিয়ায় চোখে পড়েনি। এমনকি যিনি প্রার্থী হয়েছেন, তাঁকেও এলাকার লোকজন চেনেন না। প্রার্থী সামসুদ্দিন বলেন, সাটুরিয়া উপজেলায় প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের কার্যক্রম আছে। এ ছাড়া অন্যান্য ইসলামী দলের মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন। আমি আশাবাদী, হাতপাখা প্রতীকে সাটুরিয়ায় উপজেলায় ব্যাপক ভোট পাব।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের সমঝোতার ভিত্তিতে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে এ জোটের প্রার্থী এখন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুহাম্মদ সাইদনুর। তাঁর বাড়ি মানিকগঞ্জ সদরের ছোট বাড়িয়াল গ্রামে। এলাকার ভোটাররা বলছেন, সমঝোতার কারণে জামায়াতের দেলওয়ার হোসাইন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পরই তারা সাইদনুরের নাম ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা জানতে পেরেছেন।
সাটুরিয়ায় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে মুহাম্মদ সাইদনুর বলেন, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে এলাকার মানুষ চিনতে পারবে। এ ছাড়া ১০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা এক হয়ে মাঠে আমার জন্য কাজ করবেন। সাটুরিয়া উপজেলাসহ ইউনিয়ন পর্যায়ে আমার সংগঠনের কমিটি আছে। তারা মাঠে কাজ করছেন। সংগঠনের সাটুরিয়া উপজেলা সভাপতির নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডায়েরি দেখে বলতে হবে।
লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী আবুল বাশার বাদশা ধামরাইয়ের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁর নিজ বাড়ি সাটুরিয়া সদরে হলেও সেখানে তেমন পরিচিত মুখ নন। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। নিজ দলের বাইরে তাঁর তেমন ভোটব্যাংক নেই।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রথম মানিকগঞ্জ-৩ আসনে এমপি নির্বাচিত হন মফিজুল ইসলাম খান কামাল। তিনি সাটুরিয়ার বরাইদ ইউনিয়নের সন্তান। বর্তমানে মানিকগঞ্জ পূর্ব দাশরায় বসবাস করেন। ১৯৯২ সালে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামে যোগ দেন। এ দলের হয়ে কয়েকটি নির্বাচনে অংশও নেন। ৮২ বছর বয়সী এ নেতা এবার নির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র হিসেবে। প্রবীণ নেতা হিসেবে সাটুরিয়ায় পরিচিতি থাকলেও আগে নির্বাচনে ভোট পেয়েছেন সামান্যই।
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি আওয়ামী লীগের সভাপতি দাবি করতেন। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তাঁকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একাধিকবার মারধর করেন। এতে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। তাঁর বাড়ি সাটুরিয়ার নওগাঁ তেঘরী গ্রামে। সাটুরিয়ার মানুষ তাঁকে চিনলেও মানিকগঞ্জে তেমন পরিচিতি নেই। নির্বাচনী প্রভাবও নেই। গতকাল প্রতীক পেয়ে তিনি সাটুরিয়া বাজারে নিজের অস্থায়ী নির্বাচনী কার্যালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
বাংলাদেশ জাসদের মো. শাহজাহান আলী গত সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর বাড়ি সাটুরিয়া উপজেলার ধানকোড়া ইউনিয়নের খল্লি গ্রামে। এবার তিনি উপজেলা নির্বাচনের ভোটের প্রভাব ধরে রাখতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে ভোটাররা সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আতাউর রহমান আতারও একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করলেও নির্বাচনে ভালো করার বিষয়ে আশাবাদী তিনি।
আতাউর রহমান আতা বলেন, আমার হারানোর কিছু নেই। আমি জনগণের নেতা। দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে জেল জুলুম খেটেছি। আমাকে নমিশন দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন দলে হাইকমান্ড কিন্তু দেননি। দলের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এতে হারানোর কিছু নেই। জনগণ আমার পাশে আছে, আমাকে ভোট দিয়ে বিজয় করবে।
বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা বলেন, এ আসন থেকে আমার বাবা হারুনার রশিদ খান মুন্নু তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালের পর এটি আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ১৭ বছর পর সেই আসন পুনরুদ্ধার করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ভোটাররা। আমি আশাবাদী, আসনটি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে পারব।
- বিষয় :
- প্রার্থী
