ঐতিহ্য
মেজবানির পাশে ওরস বিরিয়ানি
পটিয়ার একটি দোকানে মেজবানি মাংস ও ওরস বিরিয়ানি বিক্রিতে ব্যস্ত কর্মীরা। ছবি: সমকাল
আহমদ উল্লাহ, পটিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:১৪
গরুর মাংস, সঙ্গে হাড়-মাংস মিশ্রিত ছোলার ডাল এবং নলার ঝোল– হয়ে গেল মেজবানি। এমন আয়োজন সাধারণত কুলখানি, চেহলাম, আকিকা বা গায়ে হলুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেই মেজবানি পটিয়া উপজেলা ও পৌর সদরের ইফতারি বাজারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ছোলা-পেঁয়াজু-বেগুনির ভিড়ে জায়গা করে নিয়েছে ‘মেজবানি মাংস’ ও ‘ওরস বিরিয়ানি’। রমজানের বিকেলে পটিয়ার বিভিন্ন সড়ক মোড় ও অলিগলিতে বড় বড় পাতিলে ফুটতে দেখা যায় মসলাদার গরুর মাংসের ঝোল।
পৌর সদরের থানার মোড়, ইন্দ্রপুল কাগজীপাড়া, রেলস্টেশন রোড, পোস্ট অফিস মোড়, মুন্সেফ বাজার ও উপজেলার নিমতল দরগাহ, মনসা বাদামতল, শান্তিরহাট, কমল মুন্সিরহাট এলাকায় ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ছোলাবুট, পেঁয়াজু, বেগুনি, সমুচা, হালিমের পাশাপাশি এখন বড় ডেগে সাজানো থাকছে মেজবানি মাংস। রোজাদাররা ইফতারের সময় একটু ভিন্ন স্বাদ পেতে ভিড় করছেন এসব দোকানে। অনেকে আবার পরিবার নিয়ে বাইরে বসেই ইফতার সারছেন।
পটিয়া পৌর সদরের থানার মোড় এলাকায় রমজানের শুরুতেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে ‘ওরসওয়ালা’ নামে একটি অস্থায়ী দোকান চালু করেছেন মঈনুদ্দিন কাসেম হৃদয়। সেখানে প্রতিদিন ১০-১২ ডেগ ওরস বিরিয়ানি বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিকেল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড় থাকে।
এ বিষয়ে মঈনুদ্দিন কাসেম বলেন, ‘আমি ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত ছিলাম। সম্প্রতি চাকরি হারানোর পর হতাশ না হয়ে নিজের জায়গায় ছোট পরিসরে ওরস বিরিয়ানির দোকান শুরু করি, মানুষের সাড়া প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। রমজানকে সামনে রেখে মানসম্মত ও সুস্বাদু খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছি। ক্রেতাদের ভালোবাসাই আমার পুঁজি।’
পৌর সদরের পোস্ট অফিস এলাকার বাসিন্দা আনিসুল ইসলাম বলেন, ‘রমজানে ইফতারে মেজবানি মাংস থাকলে আলাদা একটা আনন্দ কাজ করে। আগে বড় অনুষ্ঠানে খেতাম, এখন ইফতারেও থাকছে। স্বাদও বেশ ভালো। মাটির খোরায় মেজবানি খাওয়ার আলাদা মজা আছে। কয়েকটি দোকান এখনও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।’
প্রতি কেজি মেজবানি মাংস ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ আধা কেজি বা এক প্লেট হিসেবে কিনে নিচ্ছেন। মাংসমিশ্রিত বুটের ডাল ও নলার ঝোল নিতে গুনতে হচ্ছে আলাদা টাকা।
মেজবানির পাশাপাশি এবার পটিয়ার ইফতারি বাজারে নতুন আকর্ষণ ‘ওরস বিরিয়ানি’। এক সময় মাজারের ওরস বা বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকা এই পদ এখন ইফতারের অন্যতম আকর্ষণ। মোটা সিদ্ধ চাল, হাড়সহ গরুর মাংস আর বিশেষ মসলার সংমিশ্রণে তৈরি এই বিরিয়ানির সুনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
পৌর সদরের বাইপাস এলাকায় শাহচান্দ আউলিয়া ওরস বিরিয়ানি নামের একটি অস্থায়ী দোকানে প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত ডেগ ওরস বিরিয়ানি রান্না করা হচ্ছে। বিক্রেতা আক্তারুজ্জামান বাবলু বলেন, ‘রমজানের শুরু থেকেই চাহিদা বেড়েছে। প্রতিদিন এক হাজারের বেশি প্লেট বিক্রি হচ্ছে। এক প্লেট ১১০ টাকা, আধা প্লেট ৬০ টাকা।’
উপজেলার কমল মুন্সিরহাট ও আমজুরহাট এলাকায়ও কয়েকটি দোকানে ওরস বিরিয়ানি বিক্রি হচ্ছে। শান্তিরহাট এলাকার খজা ওরস বিরিয়ানির বিক্রেতারা জানান, কম দামে পেটভরা ইফতার হিসেবে অনেকে এই পদ বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এর চাহিদা বেশি।
পৌর সদরের থানার মোড় এলাকায় ইফতারি কিনতে আসা আজিম উদ্দিন কুতুব বলেন, ‘দাম একটু বেশি। তবে রমজানে পরিবার নিয়ে ইফতার করা আলাদা আনন্দ। তাই বাইরে থেকে কিছু আইটেম নিচ্ছি।’ আরেক ক্রেতা ফারহানা সুলতানা বলেন, শিশুরা বিরিয়ানি পছন্দ করে। তাই মাঝে মাঝে ওরস বিরিয়ানি নিচ্ছি।
পটিয়া উপজেলা সদর ও আশপাশের গ্রামাঞ্চলেও এখন মেজবানি স্বাদের ইফতার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেকেই বাড়িতে ছোট পরিসরে মেজবানি রান্না করে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করছেন। কেউ কেউ বড় ডেগে রান্না করে মসজিদে বিতরণ করছেন।
