নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি বাঁধ নির্মাণ, ফসলহানির শঙ্কা
নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর রাজঘাট এলাকায় ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কারের জন্য ফেলে রাখা মাটি সমকাল
খলিলুর রহমান শেখ, নেত্রকোনা
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ধান চাষ। ধান বিক্রির টাকায় পরিবারের সব খরচ নির্বাহ হয়। প্রতিবছরই আগাম বন্যায় হাওরের ফসলহানি হতো। এই কারণে সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করে থাকে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় কয়েক বছর ধরে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু ও শেষ হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ শুরু করে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ বাঁধের কাজ গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে শুরু হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ দিনে পাউবো কাগজে-কলমে ৬৫-৭০ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন দেখায়। তবে স্থানীয়দের মতে ৫৫-৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাঁধের কাজ শেষ হতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। কারণ অনেক প্রকল্পে মাটি কাটাই এখনও শেষ হয়নি। তার ওপর মাটি সমান করা ও মাটির ওপর ঘাস লাগানো। বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় ফসলহানির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পাউবোর দাবি, এ বছর হাওরের পানি নামতে বিলম্ব হয়েছে। পিআইসি গঠনে বিলম্ব করেছে উপজেলা প্রকল্প কমিটি। এসব কারণে বাঁধের কাজ শুরু ও শেষ হতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে দ্রুতই বাঁধের সংস্কার কাজ শেষ করা হবে।
স্থানীয় অনেকের অভিমত, সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় নির্ধারিত সময়ে ফসলরক্ষার বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। হাওরে প্রয়োজন ছাড়াও ফসল রক্ষার নামে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে হাওরের নাব্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে মৎস্য ভান্ডার। অপ্রয়োজনীয় বাঁধ বাতিল করে হাওরের নাব্য ঠিক রাখার দাবি তাদের।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নেত্রকোনার ৫টি উপজেলায় ফসলরক্ষার বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব এলাকায় ৩৬৫ কিলোমিটার অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধ রয়েছে। হাওরে এক সময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণ করা হতো। ২০১৭ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কৃষক ও স্থানীয় সুবিধাভোগীদের নিয়ে ৫-৭ সদস্যের কমিটি (পিআইসি) গঠন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। এবার জেলায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হচ্ছে। বাঁধগুলোর আওতায় প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। পাউবোর ২০২টি পিআইসির মাধ্যমে হাওরের ১৩৬ দশমিক ৭৯৮ কিলোমিটার বাঁধ মেরামতের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খালিয়াজুরীতে ১৪৩টি পিআইসির ৯১ দশমিক ৩৪৪ কিলোমিটার বাঁধে ৬ লাখ ২১ হাজার ২৬০ ঘনমিটার মাটি লাগবে। যার ব্যয় ২০ কোটি ২৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। মোহনগঞ্জে ২৯টি পিআইসির ১৬ দশমিক ৫০৪ কিলোমিটার বাঁধে ১ লাখ ২০ হাজার ৩৩০ ঘনমিটার মাটি লাগবে। যার ব্যয় ৪ কোটি ৫৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা। মদনে ১৯টি পিআইসির ১২ দশমিক ২৮৪ কিলোমিটার বাঁধে ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৩৫ ঘনমিটার মাটি লাগবে। যার ব্যয় ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। কলমাকান্দায় ১০টি পিআইসির ৭ দশমিক ৪০২ কিলোমিটার বাঁধে ৩৬ হাজার ৬৪৬ ঘনমিটার মাটি লাগবে। যার ব্যয় ১ কোটি ৫৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বারহাট্টায় ১টি পিআইসির ৩০০ মিটার বাঁধে ৬০১ ঘনমিটার মাটি লাগবে। যার ব্যয় বরাদ্দ ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ১৫ ডিসেম্বর থেকে এসব প্রকল্পের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার জন্য পিআইসিকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও হাওরাঞ্চলের অনেক বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়নি।
মদন, খালিয়াজুরী ও মোহনগঞ্জের বেশ কয়েকটি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার জগন্নাথপুর রাজঘাট বাঁধে কিছু মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। পাশের আরেকটি বাঁধের অর্ধেক অংশে মাটি ফেলা হয়েছে। এটির কাজ চলমান রয়েছে। কীর্তনখোলা বাঁধের কয়েকটি পিআইসির কাজের অবস্থাও একই রকম। কোনো কোনো প্রকল্প এলাকায় দু-একজন শ্রমিক কাজ করলেও অনেক প্রকল্পে কাজের কোনো লোকও দেখা যায়নি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাঁধেই কাজ শেষ হয়নি।
কৃষকরা বলছেন, বাঁধগুলোর কাজ রাজনৈতিক দলের নেতারা করে থাকেন। এ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ায় বাঁধের কাজ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। অধিকাংশ বাঁধের কাজ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর শুরু করেছে। মার্চ মাসের চার তারিখ আজ, নিয়ম অনুযায়ী বাঁধের কাজ আরও চার দিন আগে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তাতে পুরোপুরি কাজ শেষ হতে আরও এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে। এর মধ্যেই নদীতে জোয়ার চলে এসেছে। নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। বাঁধের কাজে যেভাবে ঢিলেঢালাভাবে হচ্ছে তাতে আগাম বন্যা হলে ফসলহানি হতে পারে।
সরেজমিন কথা হয় খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক শরীফুল ইসলাম, চাকুয়া শিবির এলাকার নূর আহমদ, লিপসিয়ার আজিজুল হক, রসুলপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান, মদন উপজেলার কাতলা গ্রামের নূরুল হুদা, ঘাঠুয়া এলাকার আবুল কালাম, গোবিন্দশ্রী গ্রামের সুজন মিয়া, মোহনগঞ্জ উপজেলার বেতাম গ্রামের মাসুদ মিয়ার সঙ্গে। তারা জানান, হাওরের জমি এক ফসলি। এ ফসল বিক্রির টাকায় তাদের সারাবছরের সংসার খরচ জোটে। কিন্তু ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। আগাম বন্যায় ফসলহানির আশঙ্কা করছেন তারা।
খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর রাজঘাট, রসুলপুর ও কীর্তনখোলা ফসলরক্ষা বাঁধের পিআইসির দাবি, অন্য সাইটে ভেকু দিয়ে বাঁধে মাটি ফেলা হচ্ছে। ১৫-২০ দিনের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হবে।
খালিয়াজুরী কাবিটা প্রকল্পের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, খালিয়াজুরীতে ফসলরক্ষা বাঁধের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হয়ে যাবে।
নেত্রকোনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসাইনের ভাষ্য, হাওর থেকে পানি নামতে দেরি হয়েছে। তারপরও অন্যান্য বছরের তুলনায় কাজ অনেক দ্রুত হয়েছে। কয়েকটি বাঁধ ছাড়া অধিকাংশ বাঁধে মাটি ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাঁধের কাজ সম্পন্ন হবে।
- বিষয় :
- বাঁধ
