যোগব্যায়ামে স্বাবলম্বী নারায়ণগঞ্জের নাজ
স্বাস্থ্য সচেতনদের প্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের নাজ স্লিমিং সেন্টার। সম্প্রতি তোলা সমকাল
শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঝড় এলে কেউ আশ্রয় খোঁজে, আর কেউ ঝড়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে গড়ে তোলে নিজের ঠিকানা। দুঃসময় যখন দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখনই জন্ম নেয় এক অদম্য সাহসের গল্প। নারায়ণগঞ্জের নাজনীন আক্তার নাজ তেমনই একজন জননী ও যোদ্ধা; যিনি শখের শেখা যোগব্যায়ামকে রূপ দিয়েছেন আত্মমর্যাদা আর স্বাবলম্বিতার মহাকাব্যে। পঁচিশ বছর ধরে নারীদের ইয়োগা সেন্টার চালিয়ে আজ তিনি স্বাবলম্বী।
শুরুটা সহজ ছিল না নাজের এই পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ২৭ বছর আগে শখের বশে রোগা হওয়ার জন্য ইয়োগা শিখেছিলেন। ১৯৯৭ সালে স্বামী আতাউর রহমান প্যারালাইজড হয়ে পড়লে সংসারের পুরো ভার পড়ে তাঁর কাঁধে। একদিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীর নিথর দেহ, অন্যদিকে দুই অবুঝ সন্তানের ক্ষুধার্ত মুখ– জীবনের তরী যখন ঘূর্ণিপাকে ডুবুডুবু, তখন তিনি আঁকড়ে ধরলেন নিজের ইচ্ছাশক্তিকে। লোকের কটু কথায় তোয়াক্কা না করে বুনেছিলেন স্বপ্নের বীজ। আজ ২৫ বছর পর সেই বীজ মহিরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ তাঁর হাতের জাদুতে কেবল মেদ ঝরে না, ঝরে পড়ে সহস্র নারীর ক্লান্তি আর ব্যাধি। নারায়ণগঞ্জের অলিগলিতে আজ এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম ‘নাজ স্লিমিং সেন্টার’।
সহায়তার হাত বাড়ানোর চেয়ে উপহাস করার মানুষই ছিল বেশি। এক পর্যায়ে নিজের সেই সামান্য প্রশিক্ষণকেই পুঁজি করে শহরের ‘রিমঝিম বিউটি পার্লারে’র একটি অংশ সাবলেট নিয়ে শুরু করেন কাজ। পরে নিজের দক্ষতা বাড়াতে ঢাকার মিরপুর থেকে ভারতের ট্রেইনার সত্যজিত নারায়ণের কাছে ইয়োগার উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নারায়ণগঞ্জের প্রথম ইয়োগা ও স্লিমিং সেন্টার। এক সময় অফিসের চেয়ার-টেবিল কেনার সামর্থ্যও ছিল না নাজের। টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে এসে ফ্লোরে বসেই অপেক্ষা করতেন সেবাগ্রহীতাদের জন্য। করোনার আগে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ জন আসতেন। করোনাকালে তা শূন্যে নেমে আসে। বর্তমানে মাসে গড়ে ৫০-৬০ জন সেবা নিচ্ছেন। আগে চারজন কর্মী থাকলেও এখন একাই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন তিনি।
সংগ্রামের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে নাজ বলেন, ‘সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অনেক ছিল। একটা মেয়ের এগিয়ে যাওয়া এ সমাজে এখনও সহজ নয়। শুরুর দিকে মেঝেতে বসে স্বপ্ন দেখতাম, একদিন আমারও একটা সুন্দর অফিস হবে। আজ আমার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে।’ প্রতিষ্ঠান চালিয়েই তিনি বড় করেছেন তাঁর দুই সন্তান তাহজিদ ও তাজরিয়ানকে।
ওষুধ ছাড়াই সুস্থতার দিশা
নাজের ইয়োগা সেন্টারটি এখন অনেকের কাছে বিকল্প চিকিৎসা কেন্দ্র। নারীদের নানা জটিল শারীরিক সমস্যা, বিশেষ করে হরমোনজনিত সমস্যা বা কোমরে ব্যথার মতো কষ্টে ইয়োগা ম্যাজিকের মতো কাজ করছে। সেবাগ্রহীতা রিনা রহমান জানান, ভারতের চেন্নাইয়ের চিকিৎসকরাও তাঁকে এই ইয়োগা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শিউলি আক্তার ১০৯ কেজি ওজন নিয়ে অসুস্থতায় ভুগছিলেন, এখন তিনি ৭৫ কেজিতে নেমে এসেছেন এবং ওষুধ ছাড়াই সুস্থ আছেন। জুলেখা আক্তারের মতো অনেকেই আছেন, যারা দীর্ঘ চেষ্টার পর ইয়োগা অনুশীলনের মাধ্যমে কোনো ওষুধ ছাড়াই সন্তান ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি রিনা আহমেদ বলেন, ‘নাজ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটা উজ্জ্বল মডেল। পঁচিশ বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠান সাফল্যের সঙ্গে টিকিয়ে রাখা সহজ কথা নয়। তিনি সমাজের অন্য নারীদের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।’
ব্যবসার পাশাপাশি শীতবস্ত্র বিতরণ ও ঈদসামগ্রী দেওয়ার মতো মানবিক কাজগুলোও নাজ নিয়মিত করে আসছেন। আজ নাজের হাত ধরে সফল হয়েছেন আরও অনেক নারী উদ্যোক্তা। নাজ প্রমাণ করেছেন, ধৈর্য আর যোগব্যায়ামের শক্তি শুধু শরীর নয়, বদলে দিতে পারে একটি জীবন ও সমাজকেও।
নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ নারী সংগঠক আঞ্জুমান আরা আকসির নাজ সম্পর্কে বলেন, ‘নাজ প্রমাণ করেছেন– ঝড় যতোই তীব্র হোক, দৃঢ় মন আর পরিশ্রম থাকলে একজন নারীও হতে পারেন নিজের জীবনের স্থপতি।
- বিষয় :
- যোগ ব্যায়াম
