ঋণের জালে পোলট্রি খামারিরা
সমকাল প্রতিবেদক, টাঙ্গাইল থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ০৯:০২ | আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ১১:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
টানা চার মাস ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা। প্রতি ডিম উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ছয় টাকার মতো দামে। ফলে প্রতিটি ডিমেই প্রায় তিন টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। দিনের পর দিন এই লোকসান টেনে নেওয়া, ঋণের চাপ, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, কর্মচারীর বেতন– সব মিলিয়ে প্রান্তিক খামারিদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। অনেকে খামার গুটিয়ে ফেলেছেন, কেউ অন্য পেশায় চলে গেছেন, আবার কেউ ঋণের চাপে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে থাকছেন।
সম্প্রতি সরেজমিন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরসহ জেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে খামারিদের এমনই হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। খামারিরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ছোট ও প্রান্তিক খামারগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ভবিষ্যতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি ভোক্তার ওপর।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম চকদার একসময় এলাকার পরিচিত খামারি ছিলেন। কয়েক হাজার মুরগির খামার ছিল তাঁর। তার খামারে কাজ করতেন কয়েকজন কর্মচারীও। এখন সেই খামার নেই। জীবিকার তাগিদে তিনি একটি ভবনে দারোয়ানের কাজ করছেন। রবিউল ইসলাম বলেন, যৌবনের সব শক্তি দিয়ে খামার দাঁড় করিয়েছিলাম। সব বাধা মোকাবিলা করেও খামার চালিয়ে গেছি। ভাবছিলাম, সামনে ভালো সময় আসবে। কিন্তু সেই ভালো সময় আর এলো না। এমন খারাপ সময় এসেছে যে, শেষ পর্যন্ত বাড়িছাড়া হতে হয়েছে। এখন অন্যের ভবনে পাহারাদারি করে জীবন চলছে। যদি সরকারের একটু সহযোগিতা পেতাম, তাহলে হয়তো আজ এ অবস্থায় পড়তে হতো না।
টাঙ্গাইলকে অনেকেই ‘ডিমের রাজধানী’ বলে থাকেন। একসময় জেলার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য পোলট্রি খামারের কারণে কর্মচাঞ্চল্যে ভরা থাকত গ্রামগুলো। মুরগির খামারকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিপুল কর্মসংস্থান। কিন্তু এখন আর সেই দৃশ্য নেই। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক খামারই বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও খালি শেড পড়ে আছে, কোথাও আবার অল্প কিছু মুরগি নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন খামারিরা। যারা এখনও খামার চালাচ্ছেন, তাদের অনেকে বলছেন, তারা যেন দমবন্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। না পারছেন খামার চালাতে, না পারছেন বন্ধ করতে।
ভূঞাপুরসহ কয়েকটি উপজেলার অন্তত ২০ জন খামারি জানিয়েছেন, বাজার পরিস্থিতি এবং সরকারি সহায়তা না থাকলে ঈদের পর অনেকেই খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন। ভূঞাপুরের খামারি খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত সোমবার আমি ডিম বিক্রি করেছি সাড়ে ছয় টাকায়। অথচ প্রতিটি ডিম উৎপাদনে আমার খরচ হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা। গত চার মাস ধরে এমন লোকসান দিয়েই ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, একদিন বয়সী বাচ্চা কিনে ১৮ সপ্তাহ লালন-পালন করে ডিম উৎপাদনের উপযোগী করতে হয়। এক হাজার মুরগি পালতে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ হয়। খামারে বর্তমানে উৎপাদন প্রায় ৯০ শতাংশ। কিন্তু ডিম বিক্রি করে মুরগির খাবারের খরচই ওঠে না। আগে তাঁর খামারে তিনজন কর্মচারী কাজ করতেন। এখন একজন দিয়ে কোনোমতে খামার চালাচ্ছেন।
খামারিরা বলছেন, খামার থেকে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে; কিন্তু বাজারে সেই ডিমই অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের কাছ থেকে প্রতি হালি ডিম নেওয়া হয় ২৪ থেকে ২৬ টাকায়। কিন্তু দোকানে গিয়ে দেখা যায় সেই ডিমই ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝখানের ১০ থেকে ১৫ টাকা মধ্যস্বত্বভোগীরা নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা নিজের পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারি না। ডিলাররা যে দাম ঠিক করে দেয়, সেই দামেই ডিম দিতে হয়।
খামারিদের অভিযোগ, মুরগির খাদ্য ও ওষুধের দাম নির্ধারণেও বড় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য রয়েছে। খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এক কেজি প্রোটিনের প্রকৃত মূল্য ৯০ টাকার মতো হলেও আমাদের কিনতে হয় ২১০ টাকায়। এভাবে সব জায়গাতেই প্রান্তিক খামারিদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে।
২৪ বছর ধরে পোলট্রি খামারের সঙ্গে যুক্ত আব্দুল মালেক এখন চরম আর্থিক সংকটে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমার প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। মাসে চার লাখ টাকার বেশি লোকসান যাচ্ছে। তিন মাস ধরে বিদ্যুৎ বিল দিতে পারিনি। এখন প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা বিল বাকি। এভাবে চলতে থাকলে খামার বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন।
ভূঞাপুরের আরেক খামারি আবু হানিফ বলেন, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক খামারি দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ বিদেশে গেছে, কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ঈদের পরও যদি ডিমের দাম না বাড়ে, তাহলে আমাকেও হয়তো এলাকা ছাড়তে হবে। অন্যদিকে আলম হোসেন নামে এক খামারি জানান, তাঁর খামারে বর্তমানে ২০ হাজার মুরগি রয়েছে। তিনি বলেন, ডিমের বাজার ছয় টাকার নিচে। দেড় মাসে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এভাবে চললে এই খাত ধ্বংস হয়ে যাবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ছোট খামারিদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা দ্রুত লোকসানে পড়েন। বড় বাণিজ্যিক খামার সহজে ঋণ ও সরকারি সুবিধা পায়। কিন্তু প্রান্তিক খামারিরা তা পান না। ফলে তারা একবার ক্ষতির মুখে পড়লে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারেন না। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলো টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণেই দেশের পোলট্রি শিল্প আজ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার খাতে পরিণত হয়েছে। এই খামারিরাই এতদিন কম দামে ডিম ও মুরগি সরবরাহ করে দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মিটিয়েছেন। অথচ আজ তারা উপেক্ষিত। প্রান্তিক খামারিরা যদি টিকতে না পারেন, তাহলে গোটা শিল্প কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন তারা যে দাম ঠিক করবে, সেই দামেই ভোক্তাদের ডিম ও মুরগি কিনতে হবে।
খামারিদের অভিযোগ, পোলট্রি খাত নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নীতিমালা নেই। এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান অবশ্য স্বীকার করেছেন, আগের তুলনায় খামারের সংখ্যা কমেছে। তবে তাঁর দাবি, পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে খাতটি সুরক্ষা পাবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো, পোলট্রি খামারিদের জন্য কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি এবং ছোট খামারিদের জন্য আলাদা নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
- বিষয় :
- পোলট্রি খামার
