ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিস্তায় নেই জলের ধারা

তিস্তায় নেই জলের ধারা
×

গঙ্গাচড়ার মহিপুর সেতু এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা এখন পানিশূন্য সমকাল

 স্বপন চৌধুরী, রংপুর

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রংপুরের বড় রুপাই এলাকায় এক সময়ের খরস্রোতা তিস্তা নদী হেঁটে পার হচ্ছিলেন আইয়ুব আলী। তাঁর মতো হাজারো মানুষ খেয়াঘাট-নৌকা ছাড়াই হাঁটুপানি পেরিয়ে প্রতিদিনই নদীর চরে আবাদকৃত ফসলের দেখভাল করেন। দেশের অন্যতম নদী তিস্তার বুকে এখন জেগে উঠেছে বিশাল চর।

বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের জীবনরেখা হিসেবে ইতিহাসে তিস্তার সুনাম আছে। কিন্তু ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করায় সেই তিস্তাই এখন এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে গত ৩৮ বছরে ভারত সোয়া দুই কোটি কিউসেক পানি থেকে বঞ্চিত করেছে তিস্তাকে। 
৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খরস্রোতা তিস্তা নদী সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর ভেতর দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে। সেই চিরযৌবনা তিস্তা ক্ষীণ হতে হতে মরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে গভীরতা না থাকায় দুই কূল উপচে তিস্তাপারে দেখা দেয় বন্যা। চোখের সামনেই বসতভিটাসহ ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায় তিস্তা। পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় তিস্তা এখন এ অঞ্চলের মানুষের অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই নদীর ওপর নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার সীমান্তবর্তী দোয়ানীতে নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলে কৃষিজমিতে যে সেচ দেওয়ার কথা, সেটাও এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক গতি ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজে প্রতিদিন পানির প্রয়োজন অন্তত ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক। সেখানে পানি পাওয়া যায় মাত্র ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ কিউসেক।
প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম ধরা হলেও নভেম্বর থেকেই নদী শুকিয়ে যায়। তিস্তা ব্যারাজের উজানে ভারত ১৯৮৭ সালে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমের তিন মাসে পানির প্রয়োজন পড়ে গড়ে সাত লাখ কিউসেকের বেশি। ৩৮ বছরে পানি পাওয়ার কথা ছিল আড়াই কোটি কিউসেবের বেশি।
মৌসুমে গড়ে এক হাজার কিউসেক করে ধরা হলে পানি পাওয়া গেছে ৩৪ লাখ কিউসেক। সেই হিসাবে সোয়া দুই কোটি কিউসেক পানি থেকে বঞ্চিত হয়েছে তিস্তাপারের মানুষ। আবার বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দিয়ে দুই কূল ভাসায় ভারত। এ সময় পানির প্রবাহ থাকে প্রায় এক লাখ কিউসেক। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, এখন শুষ্ক মৌসুমে এক হাজার কিউসেকের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের সবগুলো গেট বন্ধ করে সেচ সুবিধা দিতে হচ্ছে। ফলে ভাটি এলাকায় নদীতে এক ফোঁটা পানি ছাড়ারও সুযোগ মেলে না। তবে নদীর গতিপথ ঠিক রাখতে ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

সরেজমিন দেখা গেছে, তিস্তা ব্যারাজের পানি নিয়ন্ত্রণে তৈরি ৪৪টি জলকপাটের সব কয়টিই বন্ধ। মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে পানির মৃদু ধারা। নদীতে পানি কম থাকায় পারে বেঁধে রাখা হয়েছে নৌকাগুলো। অনেকে হেঁটেই পার হচ্ছে তিস্তা। আগে ব্যরাজ এলাকায় পানি থাকত, পর্যটক আসতেন। এখন সেখানে ধুধু মরুভূমি। 
নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, বন্যা-ভাঙনসহ পানিহীন তিস্তার বহুরূপ দেখেছে এই অঞ্চলের কয়েক প্রজন্ম। তিস্তাপারের মানুষের ছুটে চলার পথ কেবল বসতভিটা আর তিস্তায় জেগে ওঠা চরের কৃষিজমি। আগে তিস্তা নদীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর এমন প্রতীক্ষায় দিন শেষ হয় এ অববাহিকার কোটি মানুষের।

আরও পড়ুন

×