ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কাজ শেষ হওয়ার আগেই কোটি টাকার ড্যামে ফাটল

কাজ শেষ হওয়ার আগেই কোটি টাকার ড্যামে ফাটল
×

নাটোরের লালপুরে খলিসা ডাঙ্গা নদীতে নির্মাণাধীন ড্যামের অ্যাপ্রোচ ওয়ালে ফাটল সমকাল

 মো. আশিকুর রহমান, লালপুর (নাটোর) 

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

নাটোরের লালপুর উপজেলার খলিসাডাঙ্গা নদীর ওপর প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম’ প্রকল্পে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দু’দফা সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন মাসে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। অথচ কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই ড্যামের অ্যাপ্রোচ ওয়ালে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে, যা যে কোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) নাটোর জোনের তথ্যমতে, জেলার সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় লালপুরে নান্দবাজার এলাকায় খলিসাডাঙ্গা নদীর ওপর এই ড্যামটি নির্মিত হচ্ছে। এটি চালু হলে প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকায় পানি সংরক্ষণ করে ৪শ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। প্রকল্পের মূল মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছিল। এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৯৭ শতাংশ। কাজটি করছে সুপারস্টার রিনিওভাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড। 
এর আগে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। নাটোর জেলার সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে লালপুর উপজেলার চন্দনা ও খলিসাডাঙ্গা নদীর প্রায় ২৭ কিলোমিটার এলাকা খনন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অ্যাপ্রোচ ওয়ালজুড়ে দীর্ঘ ফাটল ধরেছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান ও ৭ নম্বর ওয়ালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান নুরে আলম সিদ্দিকীর অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই ড্যামটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নাটোর জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম রেজা এই কাজে দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী, নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, ড্যাম দিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করা হচ্ছে। এতে নদীর পশ্চিম দিকের কৃষকরা সুবিধা পেলেও ভাটি এলাকার কৃষকরা খরা মৌসুমে তীব্র পানি সংকটে পড়বেন। 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘যে নদীকে বাঁচানোর জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হলো, সেখানে আবার কেন ড্যাম বসানো হবে? সরকার যেখানে নদী বাঁচাতে ড্যাম তুলে দিচ্ছে, সেখানে নতুন করে ড্যাম নির্মাণ নদীর জন্য ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’
নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ার সাদত বলেন, ‘বাঁধ বা ড্যাম নির্মাণ মানেই নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।’ স্থানীয়দের মতে, এই ড্যামের ফলে ভাটি এলাকায় পানিশূন্যতা এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
কাজে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বিএমডিএ নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মাটি নরম হওয়ার কারণে অ্যাপ্রোচ ওয়াল কিছুটা দেবে গেছে। ঈদের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারেনি। দ্রুতই তারা সংস্কার কাজ শুরু করবে।’ তবে প্রকল্পের মেয়াদ ৮ মাস আগে শেষ হওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।
এই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সুপারস্টার রিনিউভাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

আরও পড়ুন

×