সীমান্তে নতুন মাদকের আগ্রাসন
চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
চারঘাট-বাঘা সীমান্তে এখন আর ফেনসিডিলের বড় চালান আগের মতো ধরা পড়ে না। যে পথ একসময় হাজার হাজার বোতল ফেনসিডিল চোরাচালানের জন্য কুখ্যাত ছিল, সেখানে আজ এক ধরনের রহস্যময় নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙছে ‘এসকাফ’ নামক নতুন এক মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে নতুন মোড়কে ভারত থেকে আসছে এই সর্বনাশা সিরাপ।
পাচারের রুট ও কৌশলের পরিবর্তন
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরপাড়া থানাধীন লালকূপ এলাকাসংলগ্ন বাঘা উপজেলার আলাইপুর ও মীরগঞ্জ এলাকা দিয়ে এবং মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী থানাসংলগ্ন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মুক্তারপুর ও ইউসুফপুর এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত এসকাফ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। ভারতের ল্যাবোরেট ফার্মাসিউটিক্যালস এটি উৎপাদন করলেও নেশার কাজে ব্যবহারের কারণে সেখানে এটি নিষিদ্ধ। তবে সীমান্তসংলগ্ন জলঙ্গী ও সাগরপাড়া এলাকায় গোপনে ড্রাম ভর্তি তরল সিরাপ এনে বোতলজাত করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। পদ্মা নদীর মাঝ নদীতে জেলেদের নৌকার মাধ্যমে জালের ভেতর লুকিয়ে এসব মাদকের প্যাকেট হস্তান্তর করা হয়।
সহজলভ্যতা ও পারিবারিক বিপর্যয়
মাঝ নদীতে জালের ভেতরে মাদক সম্পর্কে পদ্মা নদীর চরে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরপাড়া ও জলঙ্গী এলাকায় এই সিরাপ প্যাকেটজাত হয়। সেখান থেকে জেলেদের নৌকায় করে মাঝ নদীতে আনা হয়। পরে জালের ভেতরে লুকিয়ে সেই প্যাকেট বাংলাদেশের জেলেদের নৌকায় হস্তান্তর করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারবারি জানান, বর্তমানে এক বোতল ফেনসিডিল ৩-৪ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এসকাফ মিলছে মাত্র ১০০০-১৫০০ টাকায়। দাম কম ও কাশির সিরাপ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সহজ হওয়ায় এর চাহিদা বাড়ছে। তবে এই সহজলভ্যতা ডেকে আনছে পারিবারিক মহাবিপদ। চারঘাট উপজেলার মেরামতপুর গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম আর্তনাদ করে বলেন, ‘আমার ছেলে নেশাগ্রস্ত। আগে ফেনসিডিল হাতের নাগালে না থাকায় উপদ্রব কম ছিল। এখন ওষুধের দোকানেও এই নতুন সিরাপ পাওয়ায় সে সকাল-বিকাল টাকার জন্য বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। টাকা না দিলে আমাদের মেরে ফেলার বা আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছে।’
উপজেলা কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির সভাপতি মাহাবুব ই আলম বলেন, ‘কিছু অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ী দোকান ছাড়া আলাদা গোডাউন ও নিজ বাসায় এসব নিষিদ্ধ ভারতীয় সিরাপ রাখছে এবং টোকেন সিস্টেমে বিক্রি করছে। আমরা নিজেরা এ বিষয়ে তদন্ত করছি এবং প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নিলে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।’
রাজশাহী জেলার ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত ওষুধ ছাড়া এ ধরনের সিরাপ ফার্মেসিতে রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমাদের অভিযান নিয়মিত চলমান আছে।’
পরিসংখ্যানে এসকাফের দাপট
গত জানুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চারঘাট ও বাঘা সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ৪৮৩ পিস ফেনসিডিল উদ্ধার করলেও এসকাফ উদ্ধার করেছে ৯২২ পিস। গত ৪ মার্চ সাহাপুর বিওপি ৬১ বোতল এবং ১৪ মার্চ সারইলে একটি প্রাইভেটকারের বিশেষ চেম্বার থেকে ২১৫ বোতল এসকাফ জব্দ করা হয়। এছাড়া ইউসুফপুর ও আলাইপুর বিওপি বিভিন্ন অভিযানে বিপুল পরিমাণ এসকাফসহ কয়েকজনকে আটক করেছে।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও সামাজিক উদ্বেগ
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক তরিকুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, ‘এসকাফ সেবন করলে কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে পড়ে এবং পুরুষের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।’ উপজেলা মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ওষুধের দোকানেও সিরাপ পরিচয়ে এটি বিক্রি হওয়া ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রাজশাহীর (সার্কেল-খ) সহকারী পরিদর্শক জাকির হোসেন ও চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলাল উদ্দিন ফারুকী জানান, মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে। এমনকি অনেক দোকানে গ্লাসে ঢেলে এটি সেবন করানো হচ্ছে। তবে বিজিবি ও পুলিশ সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছে, যাতে এই নতুন মাদকের বিস্তার রোধ করা যায়।
- বিষয় :
- মাদকের অভিযোগ
