ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচন

মর্যাদার লড়াইয়ে মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত

মর্যাদার লড়াইয়ে মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত
×

রেজাউল করিম বাদশা ও আবিদুর রহমান সোহেল

বগুড়া ব্যুরো

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৭ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৪১

বগুড়া জেলার ৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভিআইপি হিসেবে পরিচিত বগুড়া-৬ (সদর) আসন। আগামী ৯ এপ্রিল এ আসনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উপনির্বাচন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় এখানে নতুন করে ভোটের লড়াই শুরু হয়েছে। বিএনপির জন্য যেমন এই আসনটি তাদের অস্তিত্ব ও মর্যাদার লড়াই, তেমনি জামায়াতের জন্য এটি রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের এক বিশাল সুযোগ। 

বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমান বিপুল ভোটে জয়ী হলেও এবারের উপনির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই পাল্টে যেতে শুরু করেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশাকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হলেও তাঁকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল।

প্রেক্ষাপট ও ভোটের পরিসংখ্যান

বগুড়া-৬ আসনটি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা চারবার বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দখলে ছিল। সেই সময়ে এ আসনে বিএনপির জয়ের ব্যবধান ছিল আকাশচুম্বী। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও দেখা গেছে, খালেদা জিয়া ৩ লাখ ১২ হাজার ৪৪৪ কাস্টিং ভোটের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯২ ভোট পেয়েছিলেন, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর আওয়ামীরীগের মমতাজ উদ্দিন পেয়িছিলেন ৭৪ হাজার ৬৩৪ ভোট। অথ্যাৎ খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।  তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমান ২ লাখ ১৬ হাজার ২৩৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেও জামায়াত প্রার্থী সোহেল পেয়েছিলেন ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট। তারেক রহমানের প্রাপ্ত ভোট তাঁর মায়ের তুলনায় শতাংশের হিসেবে কিছুটা কম হলেও জামায়াতের ভোট আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এই পরিসংখ্যানই এবারের উপনির্বাচনে জামায়াতকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

মাঠের চিত্র ও প্রার্থী পরিচিতি

নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৩। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ২৩৭ এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৬ জন। তরুণ ও নতুন ভোটারের সংখ্যা ৭৬ হাজার। এবারের মূল লড়াই হচ্ছে ধানের শীষের রেজাউল করিম বাদশার সঙ্গে শহর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের। এ ছাড়া বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) আল-আমিন তালুকদার ফুলকপি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে থাকলেও মূল আলোচনায় আছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। বিএনপি নেতারা বগুড়ার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ধানের শীষে ভোট চাইছেন। অন্যদিকে জামায়াত ভোটারদের বোঝাচ্ছে– তারেক রহমান আসন ছেড়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতারিত।

ভোটারদের অনীহা ও রাজনৈতিক কৌশল

সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই উপনির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে প্রবল আগ্রহের অভাব রয়েছে। তারেক রহমান বা খালেদা জিয়া সরাসরি প্রার্থী না থাকায় অনেক নিয়মিত বিএনপি ভোটার ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এটি বিএনপির প্রার্থীর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। অন্যদিকে জামায়াত তাদের সংরক্ষিত ভোটব্যাংক নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন ভোটারদের টানতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। 

জামায়াত প্রার্থীর দাবি, মানুষ এবার আর ভুল করবে না এবং তারেক রহমানের আসন ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি ভোটারদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু এবং আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোট ধানের শীষের বাক্সে পড়লে সেটি বিএনপির অস্তিত্ব রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।

শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী হিরু জানিয়েছেন, তারা তাদের চেয়ারম্যানের ছেড়ে দেওয়া আসনে জেলা সভাপতিকে বিপুল ভোটে জয়ী করবেন। একইভাবে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম খায়রুল বাসার মনে করেন, ধানের শীষের বিজয় ছাড়া বগুড়ার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী সোহেল আশাবাদী, গত নির্বাচনের চেয়ে এবার তাঁর ভোট আরও বাড়বে এবং তিনি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবেন। বর্তমানে প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এ জন্য প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণার পাশাপাশি ছোট ছোট পথসভা করছেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের প্রস্তুতি

উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসন রয়েছে কঠোর অবস্থানে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও র‍্যাবের পাশাপাশি ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সেনা টহলও অব্যাহত রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট উপহার দিতে তারা বদ্ধপরিকর। এখন দেখার বিষয়, ৯ এপ্রিলের ব্যালট যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বিএনপির দুর্গ অটুট থাকে, নাকি জামায়াত তাদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণ করে নতুন কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস সৃষ্টি করে। যে পক্ষ ভোটারদের বেশি সংখ্যায় কেন্দ্রে আনতে পারবে, জয়ের মালা শেষ পর্যন্ত তাদের গলাতেই উঠবে।

আরও পড়ুন

×