ঝুট ব্যবসা হাতছাড়া হওয়ায় দ্বন্দ্ব
ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভালুকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই গত রোববার বাবা-ছেলের মধ্যে মারামারি ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়ার নারিশ কারখানা থেকে আগে ঝুট নামাতেন ছেলে তোফায়েল আহাম্মেদ রানা। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর কাজটি নিয়ে নেন তাঁর বাবা খোকা মিয়া। এরপর থেকেই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। স্থানীয় একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রোববার দুপুরে ছেলের গুলিতে বাবাসহ উভয় পক্ষের তিনজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে খোকা মিয়া ও তাঁর সহযোগী খোকন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পরই ভালুকা মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তবে গতকাল সোমবার পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় অভিযোগ দায়ের করেনি।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের ধানের শীষের প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চুর পক্ষে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সদস্য জামিরদিয়া গ্রামের খোকা মিয়া। আর রানা ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক (পরে বহিষ্কৃত) মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের পক্ষে।
নির্বাচনের আগে স্থানীয় নারিশ ফিড লিমিটেড মিলের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছিল রানার হাতে। নির্বাচনের পর ওই ব্যবসা চলে যায় তাঁর বাবা খোকা মিয়ার হাতে। অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকেই খোকা মিয়া
বিভিন্ন লোক মারফত ছেলেকে
এলাকা ছাড়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এ কারণে বাড়ির সামনে নিজের অফিসে বসতে পারছিলেন না রানা।
রোববার ঘটনার সময় রানা লোকজন নিয়ে নিজের অফিসে বসেন। এ সময় তাঁর বাবা লোকজন নিয়ে গিয়ে অফিস বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মারামারি বেধে যায়। এ সময় রানা একাধিক রাউন্ড গুলি করেন।
সূত্র বলছে, নির্বাচনে ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চু জয়লাভ করার পর উপজেলার বেশির ভাগ মিল ফ্যাক্টরির ঝুটের ব্যবসা তাঁর সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ থেকে যেগুলো এখনও নেওয়া যায়নি, সেগুলোকে কেন্দ্র করেই সংঘাত দেখা দিচ্ছে।
নারিশ ফিড লিমিটেডে বর্তমানে ঝুট ব্যবসার ওয়ার্ক অর্ডার খলিলুর রহমান ও খোকা মিয়ার নামে। খলিলুর রহমান জানান, নির্বাচনের আগে এই মিলে ঝুট ব্যবসার ওয়ার্ক অর্ডার ছিল খোকা মিয়ার ছেলে যুবদলকর্মী তোফায়েল আহাম্মেদ রানা ও আমার নামে। নির্বাচনের পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রানার নামে থাকা ৫০ ভাগের ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল করে তাঁর বাবা খোকা মিয়ার নামে করা হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান ঘিরে অস্থিরতা
গত ১৬ মার্চ জামিরদিয়া এলাকার ‘কালার মাস্টার’ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে পরাজিত প্রার্থী মোর্শেদ আলমের লোকজন ঝুট বের করার সময় খোকা মিয়ার নেতৃত্বে বাধা দেওয়া হয়। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য ইব্রাহিম খলিল পরদিন মোর্শেদ আলমসহ বিএনপির ৫০ নেতাকর্মীর নামে ভালুকা মডেল থানায় মামলা করেন। সম্প্রতি একই এলাকায় রিদিশা স্পিনিং মিল থেকে মোর্শেদ আলমের লোকজন ঝুট বের করার সময় একটি গ্রুপ মিলগেটে তাদের বাধা দেয়।
আমতলী এলাকার কটন গ্রুপের ঝুটের ব্যবসা করতেন হবিরবাড়ী ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আবু সাঈদ জুয়েল। সম্প্রতি তাঁকে বাদ দিয়ে উপজেলা যুবলীগের সিনিয়র সহসভাপতি কামরুজ্জামান পিন্টুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সততা এন্টারপ্রাইজকে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আবু সাঈদ জুয়েল বলেন, বারবার চাপ প্রয়োগ করার ফলে কারখানাটি আমার ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল করে এমপির মনোনীত কামরুজ্জামান পিন্টুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সততা এন্টারপ্রাইজকে কাজ দিয়েছে।
জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ির স্কয়ার ফ্যাশনের ওয়ার্ক অর্ডার ছিল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) শহিদুল ইসলামের নামে। সম্প্রতি তাঁকে বাদ দিয়ে এমপিপন্থিদের কাজটি দেওয়া হয়। শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি বেশ কয়েকটি কারখানার জমি কেনা, নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ ও ঝুট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কিন্তু ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর ওইসব কারখানায় আমাকে বাদ দিয়ে তাঁর মনোনীত ব্যক্তিদের নামে ওয়ার্ক অর্ডার করা হয়েছে।
পরাজিত প্রার্থী মোর্শেদ আলম বলেন, আমি ২৫ বছর ধরে যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত ছিলাম, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো মালপত্র সরবরাহ বা বের করতে চাইলে সন্ত্রাসীরা মিলগেটে বাধা দিচ্ছে। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এমনটি করাচ্ছেন।
জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, আমি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে কারও ব্যবসায় বাধা ও হুমকি দিয়ে থাকে, তাহলে এমন কথার স্পষ্ট প্রমাণ দিতে বলবেন। তিনি আরও বলেন, আমি বা আমার পরিবারের কেউ এসব মিল ফ্যাক্টরির ঝুটের ব্যবসায় জড়িত নই।
ভালুকা মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ১৭ মার্চ মোর্শেদ আলমের নামে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রোববারের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঘটনার পর ভালুকা মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ঘটনায় এখনও কোনো পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ
পাওয়া যায়নি।
- বিষয় :
- দ্বন্দ্ব
