আফসানা-মিজানের জীর্ণ কুটিরে নতুন অতিথি
স্বজনদের মিষ্টিমুখ করাতে না পারার আক্ষেপ
নবজাতকের সঙ্গে মা আফসানা বেগম
ইজাজ আহমেদ মিলন
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:৪৯ | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:২১
হঠাৎ করেই যেন আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠে জীর্ণ কুটির। না, সেখানে কোনো বিদ্যুতের নতুন বাতি জ্বলেনি– জ্বলে উঠেছে এক নতুন প্রাণের আলো। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামের সেই ছোট্ট ঘরটি, যেখানে দারিদ্র্যের ছায়া দীর্ঘদিন ধরে বাসা বেঁধেছিল, আজ ভরে উঠেছে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতায়।
প্রথম সন্তানের জন্মের সেই ক্ষণে, ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর বাবা মিজানুর রহমানের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে আনন্দের অশ্রু। জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, দুঃখ, না-পাওয়ার হিসাব যেন মুহূর্তেই মুছে যায়। হাসপাতালের দৌড়ঝাঁপে তার হাত এখন শূন্য নেই কোনো টাকা, নেই স্বজনদের মিষ্টি খাওয়ানোর সামর্থ্য। কিন্তু তবুও তার কণ্ঠে নেই কোনো আক্ষেপ। কারণ, তার পৃথিবী এখন পূর্ণ– স্ত্রী ও নবজাতক সুস্থ আছে, এ এক অমূল্য প্রাপ্তি।
পহেলা বৈশাখের সকাল। ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী তখন ৭টা ৪০ মিনিট। তখনই আফসানা আক্তারের কোল আলো করে জন্ম নেয় এক পুত্র সন্তান। নতুন বছরের প্রথম সূর্যের আলো আশীর্বাদ হয়ে নেমে আসে তাদের জীবনে। বৈশাখের রঙিন আবহে এই নবাগত শিশুটি এনে দেয় এক অন্যরকম উৎসব, একটি পরিবারের অন্তরে জন্ম নেয় নতুন স্বপ্নের বীজ।
নেত্রোকোণার কলমাকান্দ উপজেলার সন্ন্যাসীপাড়া গ্রামের ছেলে মিজান, বছর দুই আগে বিয়ে করেন এই গ্রামেরই মেয়ে আফসানাকে। শ্বশুরবাড়ির ছোট্ট এই ঘরেই গড়ে ওঠে তাদের সংসার। কিন্তু সুখের এই পথে ছিল শঙ্কার ছায়াও। গর্ভধারণের পর থেকেই আফসানার শরীর ভুগছিল অস্বাভাবিক উচ্চ রক্তচাপে। দিন-রাত উদ্বেগে কাটিয়েছেন মিজান। চিকিৎসার পর চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সবকিছুর পরও অনিশ্চয়তায় কাটে তাদের দিন।
নির্ধারিত তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পর উদ্বেগ যেন আরও ঘন হয়ে ওঠে। সোমবার দুপুর থেকে শুরু হয় প্রসব ব্যথা, যা রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হয়ে ওঠে। এক সময় ডাকা হয় স্থানীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী সালমা আক্তারকে। তিনি প্রথমে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন, কারণ আফসানার রক্তচাপ ছিল আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। কিন্তু নিয়তির লিখন ভিন্ন. শেষ পর্যন্ত ভোরের আলো ফোটার কিছু পরেই, নিজের ঘরেই জন্ম নেয় শিশুটি।
মা ও সন্তান দুজনই এখন সুস্থ। নবজাতকের প্রথম কান্না যেন ছড়িয়ে দেয় স্বস্তির সুর, আর সেই সুরে মিলিয়ে যায় সব দুশ্চিন্তা। সন্তান জন্মের পরই স্বাভাবিক হয়ে আসে আফসানার রক্তচাপ।
আফসানার কণ্ঠে তখন মাতৃত্বের কোমল দৃঢ়তা– ‘ছেলের মুখটা দেখার পর সব কষ্ট ভুলে গেছি। আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখেন, আমার ছেলেকে একজন আলেম বানাবো।’
শিশুটির নানা আক্তার হোসেন আবেগে আপ্লুত হয়ে শুধু বলেন, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। শুধু আমার নাতির জন্য দোয়া চাই।
দারিদ্র্যের সেই জীর্ণ কুটিরে আজ যে আলো জ্বলছে, তা কোনো বৈদ্যুতিক বাতির নয় এ আলো এক নতুন জীবনের, এক অনন্ত আশার। এই আলোই হয়তো পথ দেখাবে মিজান-আফসানার আগামী দিনগুলোকে।
গাজীপুর প্রতিনিধি
- বিষয় :
- গাজীপুর
- শ্রীপুর
- সমকাল
- প্রজন্মবরন ১৪৩৩
