ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্দামানে ট্রলারডুবি

নিখোঁজ স্বজনের জন্য কষ্টবুকে অপেক্ষা

নিখোঁজ স্বজনের জন্য কষ্টবুকে অপেক্ষা
×

কান্না থামছে না নিখোঁজ কিশোর আবদুল হান্নানের মা মাহামুদা বেগমের। ছবি-সমকাল

 আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার) 

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১১ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ আবছার, মোহাম্মদ জয়নাল ও আব্দুল হান্নান। তিনটি নাম, তিনটি স্বপ্ন, তিনটি পরিবারের কষ্টের অবগাহন। কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত উপজেলার শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রিপাড়ার এই তরুণরা সাগরপারেই বড় হয়েছেন। তবে দুর্ভাগা তারা। দালালের প্রলোভনে পড়ে হারিয়ে গেছেন সাগরতলে। আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার খবরে তাদের পরিবারে এখন শুধুই কান্না আর দীর্ঘ অপেক্ষা। 

শুধু এই তিনজনই নন, সীমান্তবর্তী সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার ৩০ জনেরও বেশি  যুবক এখনও নিখোঁজ। তারা সবাই দালালের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

গত ১১ এপ্রিল কোস্টগার্ড আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় এক নারীসহ ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। এই খবরে আশার আলো জ্বললেও নিখোঁজের স্বজনরা এখনও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রিয়জনের খোঁজে সীমান্তজুড়ে চলছে তালাশ। গতকাল বুধবার দিনভর টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের পাঁচটি গ্রাম ঘুরে এমন চিত্র উঠে এসেছে।   

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, গত ১ থেকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে টেকনাফ উপকূল থেকে অন্তত তিনটি যাত্রীবাহী ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। এর মধ্যে একটি ট্রলার গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ডুবে গেলেও দুটি মঙ্গলবার থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। তবে ডুবে যাওয়া ট্রলারে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই কিশোর।  

টেকনাফ শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে নাফ নদের তীরে শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ পাড়া। সেখানেই অন্যের জমিতে ঝুপড়ি আর ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে কোনোমতে দিন কাটছিল জহুরা খাতুনের। একমাত্র ছেলে ইব্রাহীম ও পুত্রবধূ জান্নাত আরা ছিলেন ওই সংসারে। হঠাৎ বদলে যায় সবকিছু। 

জহুরা খাতুন বলেন, গত ২ এপ্রিল দুপুরে ছেলে বলল ‘মা, ফোনটা রাখ, আমি এখন আসছি।’ সেই যে গেল, আর ফিরে আসেনি। এরপর সাগরে ট্রলারডুবির খবর শুনে দিন-রাত শুধু কেঁদেছি। আল্লাহর কাছে শুধু একটা কথাই বলেছি, আমার ছেলেটার খবর যেন একবার শুনতে পাই। অপেক্ষার সেই দীর্ঘ প্রহর শেষে অবশেষে ১৩ দিন পর থাইল্যান্ড থেকে একটি ফোনকল আসে।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার দালালের ফোন থেকে ছেলে কল করে জানায়, সে থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। কিন্তু ফোনে সে খুব কাঁদছিল। শুধু বলছিল ‘টাকার ব্যবস্থা করেন, এখান থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নেন।’  পাশের ঘরগুলো থেকে কান্নার শব্দ শুনে বুক ফেটে যায়। আমার ছেলে অন্তত ফোন দিয়েছে; কিন্তু অনেকের তো সেই ভাগ্যও হয়নি। তারা এখনও জানে না, তাদের সন্তান কোথায় আছে!

শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রিপাড়ার ইটের রাস্তা ধরে একটু এগোলেই শোনা যায় কান্নার আওয়াজ। নিখোঁজ কিশোর আবদুল হান্নানের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে অপেক্ষা করছিলেন মা মাহামুদা বেগম। তিনি বলেন, আমার ছোট ছেলেটার কোনো খোঁজ নেই ১৬ দিন। চারদিকে শুধু শুনি সাগরে ট্রলারডুবির কথা। এই কথা শুনলেই বুকটা ফেটে যায়, চোখের পানি আর থামে না।

তিনি অভিযোগ করেন, ফুটবল খেলার মাঠ থেকে স্থানীয় দালাল মাহামুদুর রহমান মাম্মা আমার ছেলেকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, পাচারকারীদের হাতে তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগে একটা ফোনে বলে ছেলেকে মালয়েশিয়া পাঠানো হবে, এ জন্য লাখ টাকা দিতে হবে। এখন শুনছি, ট্রলারটা নাকি সাগরের মাঝপথে ডুবে গেছে। ছেলে বেঁচে আছে না মারা গেছে, কিছুই জানি না। 

শাহপরীর দ্বীপের অনেকেই এখনও নিখোঁজ। তাদের মধ্যে রয়েছে–  মো. উসমান, মো. হারুন রশিদ, মো. সাউদ, জিয়াউর রহমান, মো. আবছার, মো. ফরিদ, জয়নাল উদ্দীন, মো. কালাইয়া, মো. হোসেন, মো. হাসান, মো. আনিস, রেদোয়ান করিম, মো. ইউসুফ, নুরুল ইসলাম, শেফায়েত হোসাইন, আবদুল হান্নান জয়নাল। 

দ্বীপের উত্তর পাড়ার ছেবন বাহার বলেন, আমার এক ঘরের দুই নাতনির এখনও খোঁজ পাইনি। সাগরে ট্রলারডুবিতে মৃত্যুর খবর পাচ্ছি। জানি না আমার নাতনিদের কী হয়েছে। 

সাগরে ভাসমান কোস্টগার্ডের হাতে উদ্ধার হওয়া রাহেলা বলেন, মালয়েশিয়ায় বিয়ের কথা বলে আমার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে সাগরপথে ট্রলারে যাত্রা করি। সেখানে ২০ নারী ছিল।  মাঝপথে  ট্রলার ডুবে গেলে আমি তেলের ট্যাঙ্কি ধরে দুই দিন এক রাত সাগরে ভাসতে থাকি। পরে একটি জাহাজ আমাকে উদ্ধার করে। আমি  অনেক মানুষের মৃত্যু দেখেছি, বাকিদের কী অবস্থা আমি জানি না। 

এ ব্যাপারে টেকনাফের ইউএনও ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় যেসব নিখোঁজের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা আমরা যাচাই-বাছাই করছি। প্রতি গ্রাম থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জড়িত পাচারকারীদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।

জাতিসংঘের উদ্বেগ 
আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবে অন্তত ২৫০ নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছে। ট্রলারটি টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। ঘটনার পর জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জরুরি সম্মিলিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাগুলো বলছে, অতিরিক্ত যাত্রী, উত্তাল সাগর ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

তাদের মতে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, শিবিরে কঠিন জীবনযাপন এবং পাচারকারীদের প্রলোভন মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। এই সংকট সমাধানে দ্রুত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জরুরি। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এমন ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রায় আরও অনেক প্রাণ অকালে হারিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের এই দুই সংস্থা।

আরও পড়ুন

×