তিস্তা-ধরলার ‘ক্ষার’ এখন মাছের সাশ্রয়ী খাবার
শুলকুর বিল থেকে শ্যাওলা সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন খামারিরা সমকাল
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাছের খাবারের আকাশচুম্বী দামের চাপে যখন কুড়িগ্রামের মৎস্য খামারিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই আশার আলো দেখাচ্ছে প্রকৃতির নিজস্ব উপহার ‘সবুজ শ্যাওলা’। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ক্ষার’। নদ-নদী ও জলাশয় থেকে বিনামূল্যে সংগৃহীত এই প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে খামারিরা কেবল উৎপাদন খরচই কমাচ্ছেন না; বরং মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করছেন। এই শ্যাওলা কুড়িগ্রামের মৎস্য শিল্পে এক নতুন নীরব বিপ্লবের সূচনা করেছে।
নদী থেকে ভ্যানে: এক অবিশ্বাস্য সাশ্রয়
সম্প্রতি জেলার ধরলা, বারোমাসিয়া ও অর্জুনডারা নদীসহ বিভিন্ন বিলে গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর দৃশ্য। জেলেরা হাঁটুসমান পানিতে নেমে বাঁশের চাটাই দিয়ে নিপুণভাবে সবুজ শ্যাওলা সংগ্রহ করছেন। এরপর সেই শ্যাওলার বিশাল স্তূপ ট্রলি বা ভ্যানে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন খামারে। খামারিদের মতে, বাজারের ২৫ কেজির এক বস্তা ফিড কিনতে পরিবহনসহ যেখানে ১৩০০ থেকে ৩০০০ টাকার বেশি গুনতে হয়, সেখানে একটি বড় ট্রলিতে প্রায় ৩ টন শ্যাওলা আনতে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ পড়ে মাত্র ২,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই খাবারের জন্য কোনো বাড়তি মূল্য দিতে হয় না বলে এটি খামারিদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে।
সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের ২০ একরের বড় পুকুরের মালিক সাহাদৎ হোসেন জানান, ‘রাসায়নিক খাবারের দাম এত বেশি যে, খামার চালানো দায় হয়ে পড়েছিল। দুই মাস ধরে এই শ্যাওলা খাওয়াচ্ছি। এতে খরচ যেমন কমেছে, মাছের ওজনও বেশ ভালো হচ্ছে।’ একই এলাকার খামারি সাহেব আলী বলেন, ‘নদীর শ্যাওলায় মাছের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। বাজারের ফিডের থেকে খরচও কম হয়। একটা ট্রাকে ৩-৪ টন শ্যাওলা নেওয়া যায়, কামলা খরচসহ ৪ হাজার টাকা পড়ে। আর ২৫ কেজি ফিড বাজারে নিতে পরিবহন খরচসহ ১৩০০ টাকার উপরে পড়ে।’ শুলকুর বাজারের খামারি সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এক বস্তা ফিড সাত দিনও যায় না, অথচ ট্রাকে করে টনের পর টন শ্যাওলা নিয়ে যাচ্ছি। এটি আমাদের জন্য মহৌষধের মতো কাজ করছে।’
বাস্তুতন্ত্র ও মাছের স্বাস্থ্য
পরিবেশকর্মীদের মতে, এসব প্রাকৃতিক খাবার ব্যবহারে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পরিবেশকর্মী রাকিবুল ইসলাম জানান, শ্যাওলা হলো মাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎস। নদী থেকে এগুলো পরিষ্কার করার ফলে জলজ পরিবেশ যেমন রক্ষা পায়, তেমনি বাস্তুতন্ত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি আরও বলেন, জেলার প্রান্তিক খামারিদের এই উদ্ভাবন প্রমাণ করেছে, সংকটের সমাধান অনেক সময় আমাদের চারপাশেই মিশে থাকে। উপযুক্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা পেলে এই প্রাকৃতিক ‘ক্ষার’ একদিন সারাদেশের মৎস্য শিল্পের জন্য মডেল হয়ে উঠতে পারে। সাংবাদিক ও সংগঠক শফি খান বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে প্রচুর শ্যাওলা বা ‘ক্ষার’ দৃশ্যমান হয়। পরিকল্পিতভাবে এটি সংগ্রহ করা গেলে জেলার মাছের উৎপাদনে আমূল পরিবর্তন আসবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, ‘প্রাকৃতিক শ্যাওলা মাছের জন্য অত্যন্ত উপযোগী খাদ্য। তবে মাছের প্রয়োজনীয় প্রোটিন নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট ব্যবধানে সুষম খাবারের পাশাপাশি এটি ব্যবহার করা উচিত।’
- বিষয় :
- মাছ
