চৈতালি বর্ষণ আর ঢলে বন্যার শঙ্কা দ্রুত ধান কাটতে প্রশাসনের মাইকিং
আকষ্মিক বন্যার শঙ্কা নিয়ে ছাতকের বোরো ফসলের মাঠে ধান কাটায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা সমকাল
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চৈতালি বর্ষণ, কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের ধাক্কায় চলতি মৌসুমে টালমাটাল সুনামগঞ্জ অঞ্চলের কৃষকদের বোরো-ভাগ্য। ছাতকসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার হাওরে জলাবদ্ধতার কারণে জমিতেই নষ্ট হচ্ছে আধপাকা ধান। এমন পরিস্থিতির মাঝেই ছাতকের বোরোচাষিদের উদ্বেগ বাড়াল বন্যার হুঁশিয়ারি।
স্থানীয় নদীগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সুরমা নদীর পানি দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এখনও বিপৎসীমার কাছাকাছি আসেনি। নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে যে কোনো সময় নামতে পারে পাহাড়ি ঢল। তখন চোখের পলকে নদীগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠবে।
সিলেটের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ দেশের সুবিস্তৃত হাওরাঞ্চলে চাষ করা হয় দেশের মোট বোরো ফসলের সবচেয়ে বড় অংশ। বৈরী প্রকৃতির কারণে এরই মধ্যে বোরো আবাদে এবার চরম অস্বস্তির মাঝে রয়েছেন এ অঞ্চলের কৃষক। সেই সঙ্গে জ্বলানি তেলের সংকট ও শ্রমিকের উচ্চ মজুরির কারণে উদ্বেগ বেড়েছে তাদের। সবশেষ আগাম বন্যার বার্তায় রীতিমতো অসহায়ত্ব বোধ করছেন উপজেলার বোরোচাষিরা।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে জমিতে ফসলের যে অবস্থা তাতে সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করলে ৬০ ভাগ জমির ফসল কাটা যাবে। অর্থাৎ বন্যা হলে ফসলহানি নিশ্চিত।
চলতি মাসের শুরুতেই এ অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির ঝুঁকি রয়েছে বলে জানানো হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়াতে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে পাকা বোরো ধান কাটার জন্য কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানায় পাউবো। যেখানে সবশেষ তথ্যমতে, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত হাওরের ৩৭ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে বলে দাবি করেছে সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগ।
বেশির ভাগ হাওরেই এখন ধান কাটার কাজ চলছে পুরোদমে। তবে আকস্মিক বন্যার বার্তায় কষ্টের ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষক।
উপজেলার বিল-হাওরের মধ্যে অধিকাংশ হাওরের মধ্যে ডেকার হাওর, নাইন্দার হাওর ও চাউলির হাওরে কিছু জলাবদ্ধতা রয়েছে। যে কারণে ধান কাটতে কৃষকদের অনেকটাই বেগ পেতে হচ্ছে। যেখানে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে, সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহে পাম্পগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় মেশিন নেই, সেখানে শ্রমিকস্বল্পতার কারণে ধান কাটায় ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। ডিজেলের স্বল্পতা এবং শ্রমিক সংকটে সময়মতো ধান কাটতে না পারার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
এ বছর উপজেলায় ৪০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ২৫টি রিপার মেশিন ধান কাটার কাজে ব্যবহার করবেন কৃষকরা। আগে ধান কাটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা হাওর এলাকায় আসতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মেশিনে ধান কাটার কারণে সে প্রবণতা কমে গেছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আরও ১০ দিন আগে উপজেলার ছৈলা আফজালাবাদ ইউনিয়নের রাধানগর এলাকায় ব্রি ১০০ জাতের ধান কাটার মধ্য দিয়ে ছাতকে বোরো ধানের নমুনা শস্য কর্তনের কাজ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হয় বোরো ধান কাটার।
চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার মোট ১৪ হাজার ৯৯৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ২ হাজার ৫২৬ হেক্টর, উফশী ১২ হাজার ৪০৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাত ৬৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এসব বোরোর আবাদ থেকে প্রায় ৬৫ হাজার টন ধান উৎপাদন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপজেলার ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৬৩টি বিল-হাওরের মধ্যে অধিকাংশ হাওরের বোরো ধান ইতোমধ্যে পাকতে শুরু করেছে। উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানিয়েছে, শনিবার পর্যন্ত ২ হাজার ৭৬৬ হেক্টর জমির বোরো ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। যার মধ্যে হাইব্রিড ১৮ শতাংশ। আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বেশির ভাগ হাওরে বোরো ধান কাটার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
কালারুকা ইউনিয়নের নুরুল্লাপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান জানান, তিনি প্রায় ২০ একর জমিতে এবার বোরো চাষ করেছেন। বৃহস্পতিবার কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ফসলের মাঠ থেকে ধান কাটা শুরু হয়েছে। নাইন্দার হাওরের কৃষক সুজন মিয়া জানান, তাঁর এলাকায় আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। এখানে ধান কাটার মেশিন নেই, সেই সঙ্গে শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। শিলাবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল আসার ভয় তো আছেই।
সরজমিন কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা গেছে, ফসলের মাঠে কোথাও ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ ধান পেকেছে। কৃষকরা বলছেন, তারা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছেন। কখনও রোদ, আবার হঠাৎ বৃষ্টি। এমন আবহাওয়ায় ধান শুকানোও কঠিন হয়ে পড়বে। ধান কাটার পর শুকাতে না পারলে গুণগত মান নষ্ট হবে। দামও কমে যাবে।
এছাড়া বোরো ধান কাটতে শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক অন্যের থেকে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ভাড়ায় এনে ধান কাটার চিন্তা করছেন। মেশিনে ধান কাটতে প্রতিদিন প্রয়োজন ১০০ থেকে ১২০ লিটার ডিজেল এবং পাওয়ার থ্রেসার মেশিনে প্রতিদিন ডিজেল প্রয়োজন ১২ থেকে ১৫ লিটার। তবে মেশিন দিয়ে ধান কাটতে গিয়ে অনেক কৃষক উপজেলার পাম্পগুলো থেকে ডিজেল পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, এবার সুনামগঞ্জে চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। অতিবৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। উজানে বৃষ্টি হলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল নামে। এতে সুরমা, কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদ-নদীতে পানি বাড়ে।
- বিষয় :
- ধান সংগ্রহ
