‘মাংস দিয়ে কবে ভাত খেয়েছি মনে পড়ে না’
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই হালিমার পরিবারের
পরিবারের সঙ্গে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রাম ইউনিয়নের ঘুঘুদহ চরমাছখালি গ্রামের হালিমা খাতুন
সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:২৯
‘মাংস দিয়ে কবে ভাত খেয়েছি, মনে পড়ে না। গত কোরবানির ঈদে প্রতিবেশীদের দেওয়া গরুর মাংস খেয়েছিলাম, তারপর আর খাওয়া হয়নি। আগামী কোরবানিতে কেউ দিলে আবার খেতে পারব’– কথাগুলো বলছিলেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রাম ইউনিয়নের ঘুঘুদহ চরমাছখালি গ্রামের হালিমা খাতুন (৬৫)।
দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, অসুস্থতা আর পারিবারিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করে কোনোভাবে দিন কাটছে তাঁর। প্রায় ১২ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালালেও বর্তমানে অসুস্থতার কারণে সেই পথও প্রায় বন্ধ।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হালিমা খাতুন এখন শুধু একটু সহায়তা আর নিশ্চিন্ত জীবনের আশায় দিন গুনছেন। তাঁর মতো অসংখ্য মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নই হতে পারে একমাত্র ভরসা।
সাত সদস্যের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়
হালিমা খাতুনের পরিবারে বর্তমানে সাতজন সদস্য। চার মেয়ের মধ্যে দুইজন বিভিন্ন কারণে মায়ের বাড়িতে ফিরে এসেছে। ছোট মেয়ে খোদেজা খাতুন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। দুর্ঘটনায় হাতের আঙুল হারানোর পর তার সংসারও টেকেনি। তিন বছরের সন্তান নিয়ে সে এখন মায়ের সঙ্গেই থাকে। মেজো মেয়ে রেখা খাতুনের স্বামী ব্লাড ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই সন্তানসহ তাঁকেও আশ্রয় নিতে হয়েছে মায়ের ঘরে। একমাত্র ছেলে আবু হানিফ অস্ত্রোপচার করে মেয়ে হয়ে (বর্তমানে ভাবনা আক্তার জেলি) ঢাকায় থাকার পর সম্প্রতি বাড়িতে ফিরেছেন। কিন্তু কোনো আয়ের উৎস না থাকায় সংসারে চাপ আরও বেড়েছে।
অসুস্থতা, অভাব আর অনিশ্চয়তার দিন
হালিমা খাতুন বলেন, ‘অনেক দিন ধরে পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। গ্রাম্য চিকিৎসকের ওষুধ খেয়ে আছি। কাজ করতে পারি না, তাই সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি আরও জানান, জাকাত-ফিতরার টাকা পেলে কাপড় কিনলেও সাবান-সোডার অভাবে সেগুলো পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে চিকিৎসা বা পুষ্টিকর খাবার তাঁর কাছে বিলাসিতা।
বয়স হয়েছে। বিধবাও হয়েছেন অনেক আগে; এখনও বয়স্ক বা বিধবা ভাতার কার্ড পাননি হালিমা খাতুন। একাধিকবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন করেও কোনো সাড়া পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। একইভাবে তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ের নামেও কোনো ভাতা কার্ড নেই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আসলাম উদ্দিন জানান, ‘হালিমা খাতুনের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।’ ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘তিনি যদি আবেদন করে থাকেন, তাহলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি যদি আবেদন না করে থাকেন, আবেদন করলে বয়স্ক ভাতা এবং তাঁর মেয়ের প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘পরিবারটির অবস্থা খুবই করুণ। তাদের জন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তা জরুরি।’
