ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অবহেলায় ঝুলে গেছে সম্ভাবনার উদ্যোগ

অবহেলায় ঝুলে গেছে সম্ভাবনার উদ্যোগ
×

 হাসান হিমালয়, খুলনা 

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ৪৬ হাজার ৮৫৪টি প্রতিষ্ঠানের ছাদে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গত বছর অক্টোবরে দরপত্র আহ্বান করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ছয়টি বিতরণ সংস্থা। লক্ষ্য ছিল ওই বছরেরই ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়ায় ত্রুটি, বিদ্যুৎ বিভাগের আন্তরিকতার অভাব এবং সরকারের নজরদারি না থাকায় প্রক্রিয়াটি ঝুলে গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের এই সময়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে বড় ধরনের সুবিধা পাওয়া যেতে পারত। কারণ প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বছরে প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ টাকার ফার্নেস অয়েল সাশ্রয় হয়। তিন হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারলে বছরে প্রায় সাত হাজার ৮০০ কোটি টাকার জ্বালানি সাশ্রয় হতো, যা এখন দ্বিগুণ দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। 

দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের বেশির ভাগেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় গ্যাস, কয়লা ও তেল। আমদানিনির্ভর এসব জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে বছরে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করার পরিকল্পনা নেয় বলে বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান। এরই অংশ হিসেবে সারাদেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য স্থাপনার ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের ২৯ জুন ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’ প্রণয়ন করা হয়। এই কাজে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগ যুক্ত হয়। শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় তিন হাজার মেগাওয়াট। সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য গত বছর ১৭ আগস্ট অনুমোদন দেওয়া হয় ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নির্দেশিকা’। সেখানে চারটি মডেল উদ্যোগে এই বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়।

মডেল-১-এ বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার অর্থায়ন করার কথা ছিল। এ ছাড়া মডেল-২ বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা অথবা কোম্পানি এবং নির্দিষ্ট শেয়ারে বিনিয়োগকারীর অর্থায়ন; মডেল-৩-এ বেসরকারি বিনিয়োগকারীর অর্থায়ন ও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ব্যবস্থাপনা এবং মডেল-৪-এ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান একক বা সম্মিলিতভাবে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন। 

এর মধ্যে মডেল-৩-এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগের ছয়টি বিতরণ কোম্পানির আওতায় সারাদেশের ৪৬ হাজার ৮৫৪টি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব ছাদে এক হাজার ৪৫৪ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। শর্ত অনুযায়ী উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো কিনে নেবে। ছাদ ভাড়াসহ অন্যান্য ব্যয় ঠিকাদার বহন করবে। ছয়টি বিতরণ সংস্থার জন্য পৃথক দর নির্ধারণ করা হয়।

বাস্তবে যা ঘটল
গত বছর ১৫ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন ধাপে দরপত্র আহ্বান ও জমা দেওয়ার সময় শেষ হয় ২৭ নভেম্বর। প্রথম ধাপে ছয়টির মধ্যে দুটি বিতরণ সংস্থার একটিও দরপত্র কেনেনি। বাকি চারটি প্রতিষ্ঠান মিলে মাত্র ১১টি দরপত্র বিক্রি হয়েছে। এরপর আরও পাঁচ ধাপ বাড়িয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দরপত্র জমার সময় শেষ হয়েছে। কিন্তু সাড়া দিয়েছে মাত্র একজন। 

দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এলাকার ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে প্রায় ৪৪ হাজার প্রতিষ্ঠানের ছাদে এক হাজার ৬৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। তাদের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ দর ৬ টাকা ২৩ পয়সা। 

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রথম দুই দফায় তাদের একটি দরপত্রও বিক্রি হয়নি। পরের দরপত্রগুলোতেও কেউ সাড়া দেয়নি। 

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৭ টাকা ৪৬ পয়সা দর নির্ধারণ করে। সাত দফায় তাদের ছয়টি দরপত্র বিক্রি হলেও কেউ জমা দেয়নি। 
নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন স্থানে এক হাজার ৯০৩টি প্রতিষ্ঠানের ছাদে প্রায় ৭১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। । তাদের দরপত্রেও সাড়া পড়েনি।

পিডিবি দেশের বিভিন্ন স্থানে এক হাজার ৬৯৭টি প্রতিষ্ঠানের ছাদে ৭২.৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। সেখানেও কেউ সাড়া দেয়নি। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডেরও (ডিপিডিসি) একই অবস্থা। 

শুধু ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) দরপত্রে একজন ঠিকাদার অংশ নিয়েছেন। তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র সাড়ে ১২ মেগাওয়াট। স্থাপনাও অনেক কম। তাদের দরপ্রতি ইউনিট ৮.৫৮ টাকা, যা অন্য সব সংস্থার থেকে বেশি। 

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জহিরুল করিম বলেন, সরকারের পরিবর্তনের পর অনেক কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। শিগগিরই করণীয় নির্ধারণে আমাদের ডাকবে। তখন হয়তো পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হবে। 

উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার কারণ
মডেল-৩-এর দরপত্রের শর্তে উল্লেখ ছিল, নিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানের ছাদে সিস্টেম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। সব পক্ষের মধ্যে ২০ বছরের লিখিত চুক্তি থাকবে। 

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, পুরো পরিকল্পনাই বাস্তবতা-বিবর্জিত মনে হয়েছে। এ কর্মসূচিতে বিনিয়োগকারী ও যন্ত্রের নিরাপত্তার বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। 

তিনি বলেন, এ কর্মসূচি সফল করতে পুরো সিস্টেম নতুন করে সাজাতে হবে। প্রতিষ্ঠান যেহেতু ভাড়া পাবে, এ জন্য ছাদ ও যন্ত্রের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান অথবা বিতরণ সংস্থাকে নিতে হবে। সোলারের সব যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। ইডকল বা বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বল্প সুদে প্রি-ফাইন্যান্সের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যুতের ব্যয় ও বাজারদর অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, সরকারের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে পরীক্ষামূলক কিছু প্রকল্প করার দরকার ছিল। তাতে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতো। এ ছাড়া এখানে ছোট ছোট ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় ব্যয় বেশি হবে। 

করণীয় কী
জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’ পরিবর্তন বা সংশোধন করা প্রয়োজন। তার আগে মডেল-১-এর মাধ্যমে সরকারি ভবনের ছাদে নিজস্ব অর্থে সোলার প্যানেল লাগাতে পারে। এতে তিন-চার মাসের মধ্যে কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে পরে অন্যান্য জায়গায় কাজে লাগানো যাবে। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট-ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। এই মুহূর্তে শর্ত সংশোধন করে নতুন দরপত্রের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের শুল্কমুক্ত পণ্য আনার সুযোগ এবং ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন উৎসাহিত করতে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা দিতে পারে।

সরকার কী চাইছে
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচিটি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি অনুবিভাগ-২ থেকে সমন্বয় করা হয়। বিতরণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা তাহমিলুর রহমান বলেন, ৩ নম্বর মডেলে আগ্রহী না হওয়ার কারণগুলো আমরা খুঁজে বের করব এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এগোব।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং নবায়নযোগ্য শক্তিবিষয়ক ফোকালপারসন কে এম আলী রেজা বলেন, আমরা দ্রুত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বসব। তাদের সমস্যা, সাজেশন এবং দরপত্রে ত্রুটি থাকলে শুনব। এরপর সচিব, মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×