ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

এক সড়কে ভুগছে চার উপজেলা

এক সড়কে ভুগছে চার উপজেলা
×

নবীগঞ্জের কাজিরবাজার থেকে মার্কুলী সড়কের বেহাল অংশে যান চলাচলে ভোগান্তি সমকাল

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

চৈত্র শেষ না হতেই সিলেটে ঝরতে শুরু করে বৃষ্টি। এরপর বৈশাখের শুরু থেকেই বিরামহীন ঝড়-বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ আবাদি জমির সোনারঙা ধান তলিয়ে গেছে। যেটুকু ফসল তোলা গেছে, সেটুকু শুকানো, মাড়াই ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কৃষকদের।

ধান পরিবহনে সবচেয়ে বেশি কষ্ট সইতে হচ্ছে নবীগঞ্জ উপজেলাধীন কাজিরবাজার থেকে মার্কুলী পর্যন্ত এলাকার মানুষকে। কারণ কাজিরবাজার-মার্কুলী হয়ে দিরাই-শাল্লা পর্যন্ত সড়কের বিধ্বস্ত পরিস্থিতি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই একটি বেহাল সড়কের কারণে হবিগঞ্জের চারটি উপজেলার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। চলতি মৌসুমে সড়কের কারণে কৃষকের শেষ সম্বলটুকুও নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে।

জলমগ্ন ফসলের জমি থেকে অনেক কৃষক ধান কাটলেও সেগুলো হাওরপার থেকে চাতাল বা খলায় নিতে গিয়ে বিপত্তির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। অনেকে বাজারে বা গুদামে ধান-চাল নেওয়ার জন্য যানবাহন পাচ্ছেন না। পেলেও ভাড়া পড়ছে অনেক বেশি। 

হাওরপার থেকে ফেরা কৃষকরা জানান, শ্রমিক, হারভেস্টার থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে উৎপাদনে। ধান পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বিশেষ করে ভাটি অঞ্চলের বোরো ধান আনা-নেওয়ার কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটছে। নবীগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সড়কটি সীমাহীন জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় এই সড়কের কোথাও না কোথাও ধানবোঝাই ট্রাক আটকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক ঘণ্টার জন্য চালু হলে আবার কিছু সময় পরেই ঘটছে বিপত্তি।
ঘুঙ্গিয়াজুরী হাওরের কৃষক আব্দুল কাহার চৌধুরী বলেন, বেহাল সড়কের কারণে ধীরে ধান কাটতে হয়েছে। এক সঙ্গে বেশি কাটা হলে আনার উপায় থাকে না। সড়ক ভালো থাকলে দ্রুত ধান সরানো যেত। বিলম্বের কারণে প্রায় একশ একর জমির ধান আনতে পারেননি।

স্থানীয় ধানের আড়তদার আব্দুল মতিন বলেন, কাজিরবাজার-মার্কুলী বেহাল এই সড়কের জন্য তাদের ধান আনা-নেওয়া করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। এমনিতেই অধিকাংশ পরিমাণ ধান এবার ভেজা। একবার ট্রাক উল্টে সড়কে পড়লে ওসব ধান বা চাল কাজে আসবে না তাদের। টানা বৃষ্টির কারণে সড়কের গর্তগুলোতে পানি জমে আছে। এতে চলাচল আরও কঠিন হয়ে গেছে।
আড়তদার শৈলেন্দ্র দাশ বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে ধান আনা নেওয়া করতে কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের। কৃষকরাও সময়মতো ধান পাঠাতে পারছেন না। ধানবোঝাই ট্রাকগুলো গর্তে পড়লেই উল্টে যায়।

নবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফজলুল হক মনি বলেন, নবীগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ধান আনার জন্য নবীগঞ্জ-কাজির বাজার, মার্কুলী-দিরাই-শাল্লা সড়ক ব্যবহার করতে হয়। যার কারণে ধান আনা-নেওয়ায় চরম ব্যাঘাত ঘটছে। টানা ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ৪০০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন আবার বৃষ্টির পানিতে সড়কের বেহাল দশা ধান আনতে পুরোদমে ব্যাঘাত হচ্ছে।
নবীগঞ্জের কাজীগঞ্জ বাজার টু মার্কুলী ভায়া শাল্লা দিরাই সড়ক যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা, বিকল হচ্ছে গাড়ি। ঝুঁকি আর দুর্ভোগ এ সড়ক দিয়ে চলাচলকারী কয়েক হাজার মানুষের নিত্যসঙ্গী। নবীগঞ্জ অংশের কাজীগঞ্জ বাজার টু মার্কুলির ১৭ কিলোমিটার সড়ক এমন বেহাল দীর্ঘদিনের। এতে চরম ভোগান্তি আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন সড়কটিতে চলাচল করছেন উপজেলার হাজারো মানুষ। 

সরেজমিন দেখা গেছে, নবীগঞ্জ শহর থেকে হওরাঞ্চল, বানিয়াচং, দিরাই, শাল্লার সঙ্গে এই সড়কের যোগাযোগ। শহর থেকে শেষ সীমানা পর্যন্ত মেইন সড়ক যেন একেকটা সর্বনাশা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীবাহী সিএনজি, ইজিবাইক ও মালবাহী বিভিন্ন ধরনের ট্রাক, পিকআপ, মোটরসাইকেল, অ্যাম্বুলেন্সসহ শত শত গাড়ি চলাচল করে।
নবীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিদ আহমদ তালুকদার বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরু হলে বৃষ্টিতে বিভিন্ন গর্তে পানি জমে সড়কের দুর্ভোগের শেষ নেই। নবীগঞ্জ, বানিয়াচং, দিরাই, শাল্লা ৪টি উপজেলার হাওর থেকে এই সড়ক দিয়ে ধান নবীগঞ্জ হয়ে মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা ও ভৈরব আড়তে যেতে পারছে না। সাধারণ মানুষ এতে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। রহমত আলী নামে একজন জানান, প্রতিদিন সড়কটি দিয়ে বিভিন্ন স্থানে আমাদের যাতায়াত করতে হয়। 
নবীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বড় ভাকৈর ও পশ্চিম বড় ভাকৈর ইউনিয়ন এর বাসিন্দাদের একাধিক ব্যক্তি জানান, বর্তমানে সড়কটির যে দশা তাতে রিকশা, সিএনজি বা যে কোনো পরিবহনে উঠতেই ভয় হয়। ২ নম্বর ভাকৈর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন ছুবা বলেন, একে বাজার দর ভালো নেই। জমিতে অনেক ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। সময়মতো ধান বাজারে নিতে না পারলে এবার বোরো চাষিদের বাঁচার পথ থাকবে না।
 

আরও পড়ুন

×